২৬ অক্টোবর, ২০১৫

বানু আল-মুসতালিক হামলা-২: "মুমিন বনাম মুনাফিক" – বিভাজনের শুরু!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-৯৮) ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – বাহাত্তর

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯ পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ > পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩ > পর্ব ৬৪ > পর্ব ৬৫ > পর্ব ৬৬ > পর্ব ৬৭ > পর্ব ৬৮ > পর্ব ৬৯ > পর্ব ৭০ > পর্ব ৭১ > পর্ব ৭২ > পর্ব ৭৩ > পর্ব ৭৪ > পর্ব ৭৫ > পর্ব ৭৬ > পর্ব ৭৭ > পর্ব ৭৮ > পর্ব ৭৯ > পর্ব ৮০ > পর্ব ৮১ > পর্ব ৮২ > পর্ব ৮৩ > পর্ব ৮৪ > পর্ব ৮৫ > পর্ব ৮৬ > পর্ব ৮৭ > পর্ব ৮৮ > পর্ব ৮৯ > পর্ব ৯০ > পর্ব ৯১ > পর্ব ৯২ > পর্ব ৯৩ > পর্ব ৯৪ > পর্ব ৯৫ > পর্ব ৯৬ > পর্ব ৯৭

বানু লিহায়েন গোত্রের ওপর অতর্কিত হামলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কী অজুহাতে "বানু আল-মুসতালিক" গোত্রের ওপর আক্রমণাত্মক (Offensive) হামলার মাধ্যমে তাঁদের দশ জন লোককে হত্যা ও স্ত্রী, সন্তান, পরিবার-পরিজনদের বন্দী করে দাস ও যৌনদাসীতে রূপান্তর ও সমস্ত সম্পত্তি লুণ্ঠন করে  নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন, এই মানবতাবিরোধী অপকর্মটি সাধনের পর এক মুহাজির কীভাবে এক আনসারকে দৈহিক আক্রমণের মাধ্যমে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে কোন্দলের সূত্রপাত করেছিলেন, এই ঘটনার পর আবদুল্লাহ বিন উবাই নামের এক বিশিষ্ট আনসার গোত্রপ্রধান রোষান্বিত হয়ে কী মন্তব্য করেছিলেন - তার বিস্তারিত আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো: মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে এই কোন্দলটির মুখ্য ইস্যু হলো, "এক মুহাজির এক আনসারকে দৈহিক আক্রমণ করেছে --!" তারই প্রতিক্রিয়াই মদিনার আল-খাযরাজ গোত্রপ্রধান রাগান্বিত হয়ে এক মন্তব্য করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে, কিন্তু এই আনসার গোত্রপ্রধান কোনো মুহাজিরকেই খুন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেননি। আবদুল্লাহ বিন উবাই যে-স্থানটিতে ঐ মন্তব্যটি করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে, সেই ঘটনাস্থলে মুহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন না। অর্থাৎ মুহাম্মদ এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না, তিনি তা শুনেছেন।

প্রশ্ন ছিল:
ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ কীভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিলেন এক "মুনাফিক (মিথ্যাবাদী-ভণ্ড)" এবং এই ঘটনাটির পর মুহাম্মদ ও মুহাজিররা আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের বিরুদ্ধে কী রূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন? কতজন লোকের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মুহাম্মদ নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তিনি যা শুনেছেন তা অবশ্যই সত্য এবং আবদুল্লাহ বিন উবাই অবশ্যই মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড?

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1][2][3]  

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ৯৭) পর:

‘যায়েদ বিন আরকাম [4] তা শুনতে পায় ও আল্লাহর নবীর কাছে গিয়ে তা তাঁকে বলে দেয়, তিনি তখন শত্রুদের বিলিব্যবস্থা নিষ্পত্তি করছিলেন।

উমর, যিনি তাঁর সাথেই ছিলেন, বলেন, "আববাদ বিন বিশার কে হুকুম করুন যেন সে তাকে খুন করে।" আল্লাহর নবী জবাবে বলেন, "কিন্তু লোকেরা যদি বলে যে, মুহাম্মদ তাঁর নিজ অনুসারীদের হত্যা করে? না, যাত্রারম্ভ করার হুকুম করো।"

('Umar, who was with him, said, 'Tell 'Abbad b. Bishr to go and kill him.' The apostle answered, 'But what if men should say Muhammad kills his own companions? No, but give orders to set off').

সেই সময়টি ছিল এমন, যখন আল্লাহর নবী সচরাচর যাত্রারম্ভ করতেন না। লোকেরা যথারীতি যাত্রা শুরু করে। যখন আবদুল্লাহ বিন উবাই শুনতে পান, তিনি যা বলেছেন, তা যায়েদ আল্লাহর নবীকে বলে দিয়েছে, তিনি তাঁর কাছে যান ও শপথ করে বলেন যে, তাঁকে যা বলা হয়েছে, তা তিনি বলেননি।

তাঁর [আবদুল্লাহ বিন উবাই] লোকদের কাছে তিনি ছিলেন এক মহান ব্যক্তি (Great man); আল্লাহর নবীর সঙ্গে তখন যে-আনসাররা উপস্থিত ছিল, তারা বলে, "এটাই সঠিক হতে পারে যে, তিনি যা বলেছেন এই বালকটি তা ভুল বুঝেছে ও তাঁর সেই কথাগুলো মনে রাখেনি", তারা ছিল ইবনে উবাইয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল ও তাঁকে রক্ষার চেষ্টা করছিল।

যখন আল্লাহর নবী যাত্রা শুরু করেন, উসায়েদ বিন হুদায়ের (Usayd b. Hudayr) তাঁর সঙ্গে দেখা করে ও তাঁকে আল্লাহর নবীর সম্মাননায় সালাম করে, বলে, "আপনি বিসদৃশ সময়ে যাত্রা করছেন, যা আপনি আগে কখনোই করেননি।" আল্লাহর নবী বলেন, "তোমার বন্ধু যা বলেছে, তা কি তুমি শোনোনি? সে ঘোষণা করেছে যে, তার মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পর শক্তিমানরা দুর্বলদের তাড়িয়ে দেবে।"

সে জবাবে বলে, "যদি আপনি চান তবে আপনি তাকে বিতাড়িত করতে পারেন; সে হলো দুর্বল, আর আপনি হলেন শক্তিমান।" সে আরও বলে, "তার সাথে সদয় আচরণ করুন, কারণ তাকে রাজমুকুট পরানোর জন্য যখন তার লোকেরা জপমালা গাঁথছিল, তখন আল্লাহ আপনাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে; সে মনে করে যে, আপনি তাকে রাজত্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন।"

তারপর আল্লাহর নবী তাঁর লোকদের নিয়ে দিবাবসানের পূর্ব পর্যন্ত সারাদিন, প্রভাত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সারারাত ও তার পরের দিন সূর্যতাপে পীড়িত হওয়া পর্যন্ত যাত্রা চালিয়ে যান। তারপর তিনি তাদের সাময়িকভাবে থামান। তারা ভূমিতে শরীর ঠেকানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ে। আবদুল্লাহ বিন উবাই আগের দিনে যা বলেছে তা থেকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার জন্য তিনি এটা করেছিলেন।

হিজাজের ভেতর দিয়ে (আল তাবারী: 'বিকেল বেলা') তিনি তাঁর যাত্রা অব্যাহত রাখেন, যে পর্যন্ত না তিনি সুদূর আল-নাকির (al-Naqi') সামান্য আগে 'বাকা' (Baq'a) নামের এক জলসেচন/জল-পানের স্থানে এসে পৌঁছেন। যেহেতু তিনি রাত্রিতে ভ্রমণ করছিলেন, প্রবল বাতাস লোকদের পীড়িত করছিল, যা তাদের আতঙ্কের কারণ হয়েছিল। তিনি তাদের বলেন যে, ভয় পাবার কিছু নেই, কারণ এই বাতাস ঘোষণা দিচ্ছে, সর্বশ্রেষ্ঠ অবিশ্বাসীদের একজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা মদিনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেই দিন আনুগত্যহীন লোকদের গোপনে আশ্রয়দাতা, রিফা বিন যায়েদ বিন আল-তাবুত নামের বনি কেইনুকা গোত্রের এক গণ্যমান্য ইহুদির মৃত্যু হয়েছে।

সূরা অবতীর্ণ হয় যেখানে আল্লাহ আবদুল্লাহ বিন উবাই ও তার সাথে সমমনা আনুগত্য-হীন লোকদের বিষয়ে উল্লেখ করেছে। যখন তা অবতীর্ণ হয়, আল্লাহর নবী যায়েদ বিন আরকামের কান ধরেন ও বলেন, "এই সেই ব্যক্তি যে তার কানকে আল্লাহর জন্য একান্তভাবে নিয়োজিত করেছে (আল-তাবারী: 'এই সেই ব্যক্তি যার কর্ণপাত আল্লাহ নিশ্চিত করেছে)।" আবদুল্লাহ বিন ‌উবাইয়ের পুত্র আবদুল্লাহ তার পিতার এই বিষয়টি শুনতে পান।’
(অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক)

মুহাম্মদের ভাষায় (কুরান): [5]

[বাগাড়ম্বরপূর্ণ- স্বেচ্ছাচারী, হুমকি-শাসানি ও শাপ-অভিশাপ জাতীয় বাক্য পরিহার]

৬৩:১-৩-‘মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। (২) তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ। (৩) এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফের হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না।’ 

৬৩:৭-৮-‘তারাই বলেঃ আল্লাহর রাসূলের সাহচর্যে যারা আছে তাদের জন্যে ব্যয় করো না। পরিণামে তারা আপনা-আপনি সরে যাবে। ভূ ও নভোমন্ডলের ধন-ভান্ডার আল্লাহরই কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না। (৮) তারাই বলেঃ আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিস্কৃত করবে। শক্তি তো আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।’

>>> এক মুহাজিরের পায়ের লাথির আঘাতে অপমানিত ও আক্রান্ত হয়েছেন এক আনসার! এরই প্রতিক্রিয়ায় আবদুল্লাহ বিন উবাই নামের এক বিশিষ্ট আনসার গোত্রপ্রধান হয়েছেন রোষান্বিত! রোষান্বিত অবস্থায় তিনি আক্ষেপ করে মন্তব্য করেছেন যে, "মুহাজিররা" তাঁদের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রবল তর্ক করে, তারা তাঁদের নিজের দেশ মদিনায় এসে দল ভারি করে ও তাঁদের কোনোকিছুই এই কুরাইশদের পছন্দ নয় (পর্ব: ৯৭)।

আদি উৎসের ওপরের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, “যখন আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করবো, শক্তিমানরা দুর্বলদের তাড়িয়ে দেবে" বলে আবদুল্লাহ বিন উবাই যে-মন্তব্য করেছেন বলে এক অল্পবয়স্ক বালক মুহাম্মদের কাছে এসে অভিযোগ করেছিল, এই গোত্রপ্রধান শপথ করে তা অস্বীকার করেছিলেন। আর মুহাম্মদের সঙ্গে তখন যে মুহাম্মদ-অনুসারী আনসাররা উপস্থিত ছিলেন, তারাও যে-মতামত দিয়েছেন, তা হলো, "এটাই সঠিক হতে পারে যে, তিনি যা বলেছেন এই বালকটি তা ভুল বুঝেছে--।" অর্থাৎ আবদুল্লাহ বিন উবাই যে অবশ্যই মিথ্যাবাদী (Hypocrite), মুহাম্মদের এই দাবির সপক্ষে "একমাত্র সাক্ষী" হলো এক অল্পবয়স্ক বালক!

আদি উৎসের ওপরের বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি যে, যখন যায়েদ বিন আরকাম নামের এই অল্পবয়স্ক বালক মুহাম্মদকে আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের ঐ তথাকথিত মন্তব্যটি অবহিত করান, তখন মুহাম্মদের সাথে ছিলেন তাঁর প্রিয় অনুসারী উমর ইবনে খাত্তাব। ঘটনাটি শোনার পর কোনোরূপ সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়াই উমর মুহাম্মদকে অনুরোধ করেন যে, তিনি যেন আবদুল্লাহ বিন উবাই-কে খুন করেন। অপরপক্ষে, আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের পক্ষের লোক (আনসার) আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও কোনো মুহাজিরকেই খুন করার কোনো অভিপ্রায় ব্যক্ত করেননি। পার্থক্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট!

কে এই আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল?

এই সেই অসীম সাহসী আদি মদিনাবাসী খাযরাজ গোত্রপ্রধান আবদুল্লাহ বিন উবাই, যিনি বনি কেইনুকা (পর্ব: ৫১) ও বনি নাদির গোত্রের (পর্ব: ৫২ ও ৭৫) বিরুদ্ধে মুহাম্মদের অনৈতিক নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধের বিপক্ষে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছিলেন। যাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বনি কেইনুকা ও বনি নাদির গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদের করাল গ্রাস থেকে প্রাণে বাঁচতে পেরেছিল। এই সেই আবদুল্লাহ বিন উবাই, যিনি ওহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মদের সাথে মতভেদের কারণে এক-তৃতীয়াংশ সৈন্যসহ মাঝপথ থেকে মদিনা প্রত্যাবর্তন করেছিলেন (পর্ব: ৫৫)। 

মুহাম্মদের স্বরচিত ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থ (Psycho-Biography) হলো কুরান (পর্ব: ১৪ ও ১৬-১৭); মুহাম্মদ তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের বাহন হিসাবে "তাঁর আল্লাহ ও জিবরাইলকে" সৃষ্টি করেছেন, মুহাম্মদের প্রতি অবিশ্বাসে তাঁর এই আল্লাহ ও জিবরাইলের কোনো অস্তিত্ব নেই। সুতরাং বানু আল-মুসতালিক হামলার প্রাক্কালে মুহাজির ও আনসারদের এই কোন্দলের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ জিবরাইল মারফত সূরা মুনাফিকুন অবতীর্ণ করে আবদুল্লাহ বিন উবাই যে অবশ্যই মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড (Hypocrite) বলে সাক্ষ্য দিয়েছে বলে মুহাম্মদ দাবি করেছেন, তাতে আশ্চর্য হবার কোনো কারণ নেই। এটি একান্তই মুহাম্মদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা-ভাবনা ও বিবেচনাবোধের বহিঃপ্রকাশ।

মুহাম্মদ তাঁর এই ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থের সূরা মুনাফিকুন অধ্যায়ে আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের নাম উল্লেখ করেননি। শুধু সুরা মুনাফিকুনই নয়, মুহাম্মদ তাঁর এই স্বরচিত গ্রন্থে ফেরেশতা, পূর্ববর্তী নবী-রসুল, পৌত্তলিকদের দেবতা ও পুরাকালের ইতিকথার চরিত্রের নামগুলো ও মুহাম্মদের সমসাময়িক সময়ের মাত্র দু'জন ব্যক্তির নাম ছাড়া (পর্ব: ৩৯) অন্য কোনো ব্যক্তির নাম এবং কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কোন বাণী রচনা করেছেন ("শানে নজুল"), তার কোনো দিকনির্দেশনা উল্লেখ করেননি। তাই সিরাত ও হাদিসের সাহায্যে "শানে নজুল" নির্ধারণ ব্যতিরেকে তাঁর রচিত এই গ্রন্থের সঠিক অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয় (পর্ব: ৪৪)। [6] [7]

বানু আল-মুসতালিক হামলা-পরবর্তী এই ঘটনার পূর্বে একজন মুসলমান অন্য একজন মুসলমানকে কখনো কোনো শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে কোন্দলে লিপ্ত হয়েছিলেন, এমন তথ্য ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। আর মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের মধ্যে এই সর্বপ্রথম শারীরিক আক্রমণের ঘটনার কোনো তদন্ত, বিচার ও এরূপ ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কোনোরূপ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, এমন তথ্যও আদি উৎসের কোথাও বর্ণিত হয়নি।

মুহাম্মদের স্বরচিত জবানবন্দি কুরান, সিরাত ও হাদিসের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - এই ঘটনার পর তিনি আক্রান্ত পক্ষেরই গোত্রনেতাকে তাঁর আল্লাহর বাণীর অজুহাতে মুনাফিক (Hypocrite) রূপে অভিযুক্ত করেছেন। আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি: মুহাম্মদ উমরের ঐ মন্তব্যের কোনরূপ প্রতিবাদ না করে ঘোষণা দেন, "কিন্তু লোকেরা যদি বলে যে, মুহাম্মদ তাঁর নিজ অনুসারীদের হত্যা করে?" যার সরল অর্থ হলো, কোনোরূপ সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়াই এমত পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে হত্যা করায় কোনো অন্যায় নেই, কিন্তু মুহাম্মদ তা করেননি লোকেরা তাঁকে "অনুসারী হত্যার অপবাদ” দেবে এই ভেবে।

এই ঘটনাটিই হলো ইসলামের ইতিহাসে মুহাম্মদের অনুসারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম বিভাজন! জন্মদাতা স্বয়ং মুহাম্মদ - যা তিনি সত্যায়িত করেছেন "তাঁর আল্লাহর" সিলমোহরে ঐশী বাণী অবতারণার মাধ্যমে।

আর এই অভিযোগটি এমনই এক অভিযোগ, যা যে কোনো মুহাম্মদ-অনুসারী তার সাথে মতভেদকারী অন্য যে কোনো মুহাম্মদ-অনুসারীর বিরুদ্ধে অবলীলায় প্রয়োগ করতে পারেন। আবদুল্লাহ বিন বিন উবাই ও তাঁর মতই মানসিকতার অধিকারী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অনুসারীরা যখনই মুহাম্মদের বাণী ও কর্মের সমালোচনা করেছেন তাঁদেরকেই মুহাম্মদ 'মুনাফিক' রূপে আখ্যায়িত করেছেন। মুহাম্মদের এই শিক্ষারই ধারাবাহিকতায় তাঁর অনুসারীরা মুহাম্মদের মৃত্যুর দিন থেকে ("তাঁর লাশ বিছানায় ফেলে রেখে" -বিস্তারিত পরে আলোচনা করবো) পরবর্তী সমস্ত সময় তাদের নিজেদের মধ্যে যত কলহ-বিবাদ, যুদ্ধ-লড়াই, খুন-খারাবী ও নৃশংসতা প্রদর্শন করেছেন (পর্ব- ৮২); সর্বত্রই তাঁরা একে অপরকে এই বিশেষ খেতাবে ভূষিত করেছেন। যার জের চলছে আজও!

যতদিন ইসলাম বেঁচে থাকবে, মুহাম্মদের শিক্ষায় শিক্ষিত অনুসারীরা একে অপরকে এই খেতাবে অভিযুক্ত করে পরম একাগ্রতায় "মুহাম্মদের ঐশী বাণী জপতে জপতে” নিজেদের মধ্যে এমনই কলহ-বিবাদ, যুদ্ধ-লড়াই, খুন-খারাবী ও নৃশংসতা চালিয়ে যাবে। যতদিন ইসলাম তার "আদি মুহাম্মদ-রূপে" বেঁচে থাকবে, ততদিন এই অভিশাপ থেকে তাঁদের মুক্তি মিলবে না।

মুহাম্মদ তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে সমগ্র মানবজাতিকে শুধু “মুসলিম বনাম অমুসলিম” রূপেই বিভক্ত করেননি, তিনি বিভক্ত করেছেন তাঁর অনুসারীদেরও। সেই বিভাজনের নাম "মুমিন বনাম মুনাফিক"!"

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হারাম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে।] 

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৪৯১-৪৯২

[2] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫১২-১৫১৪ 

[3] অনুরূপ বর্ণনা (Parallal):  কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৪১৭-৪১৯
ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; Simultaneously published in the USA and Canada in 2011 by Routledge: 2 Park square, Milton park, Abington, Oxon, OX14 4RN and  711 Third Avenue, New York, NY 10017; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ২০৩-২০৫

 [4] 'যায়েদ বিন আরকাম বিন কায়েস আল্লাহর নবীর সঙ্গে ১৭টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি কুফায় অভিবাসী হোন ও আলীর পক্ষে সিফফিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ৭৮৪-৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দের (হিজরি ৬৫-৬৮ সাল) মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।'

[5] সূরা মুনাফিকুন (মদীনায় অবতীর্ণ), আয়াত সংখ্যা- ১১ http://www.quraanshareef.org/index.php?arabic=&sid=63&ano=11&st=0

[6] ইবনে কাথিরের কুরান তফসির: