২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

বনি কুরাইজা গণহত্যা – ৮: কেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড?: কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ৯৪): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – আটষট্টি

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯ পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ > পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩ > পর্ব ৬৪ > পর্ব ৬৫ > পর্ব ৬৬ > পর্ব ৬৭ > পর্ব ৬৮ > পর্ব ৬৯ > পর্ব ৭০ > পর্ব ৭১ > পর্ব ৭২ > পর্ব ৭৩ > পর্ব ৭৪ > পর্ব ৭৫ > পর্ব ৭৬ > পর্ব ৭৭ > পর্ব ৭৮ > পর্ব ৭৯ > পর্ব ৮০ > পর্ব ৮১ > পর্ব ৮২ > পর্ব ৮৩ > পর্ব ৮৪ > পর্ব ৮৫ > পর্ব ৮৬ > পর্ব ৮৭ > পর্ব ৮৮ > পর্ব ৮৯ > পর্ব ৯০ > পর্ব ৯১ > পর্ব ৯২ > পর্ব ৯৩

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা মদিনার বাজারে গর্ত খুঁড়ে সেই গর্ত পাশে বনি কুরাইজা গোত্রের সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যদের (৬০০-৯০০ জন) দলে দলে ধরে এনে এক এক করে গলা কেটে হত্যা করার পর  কী নিয়মে মুহাম্মদ তাঁদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন, এই সম্পদের কী পরিমাণ হিস্যা তিনি একাই গ্রহণ করেছিলেন, কোন ঐশী বাণী অবতারণার মাধ্যমে তিনি এই লুটের মালে জীবিকা অর্জনের বৈধতা প্রদান করেছিলেন (পর্ব: ২৮), কীভাবে তিনি তাঁদের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে যৌনদাসীতে রূপান্তরিত করেছিলেন ও রায়হানা নামের এক সুন্দরী রমণীকে তিনি তাঁর নিজের জন্য মনোনীত করেছিলেন, পরবর্তীতে এই যৌনদাসীদের অনেককে কীভাবে তিনি বিক্রি করেছিলেন, সেই বিক্রয়লব্ধ উপার্জনের মাধ্যমে তিনি কী খরিদ করেছিলেন - ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আদি উৎসের ইসলামে নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম ঐতিহাসিকদের খন্দক যুদ্ধের বর্ণনার (পর্ব: ৭৭-৮৬) পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে যে-বিষয়টি সুস্পষ্ট, তা হলো - বনি নাদির গোত্রের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের মতই বনি কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধে আরোপিত মুহাম্মদের অজুহাত সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বনি নাদির ও বনি কুরাইজা গোত্রের লোকেরা ছিলেন নিরপরাধ ও নির্দোষ।

প্রশ্ন হলো, কী উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ নিরপরাধ বনি কুরাইজা গোত্রের লোকদের ওপর এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন?

মুহাম্মদের স্বরচিত ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থ (Psycho-biography) কুরান ও আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই লিখিত ‘সিরাত’ (মুহাম্মদের জীবনী) ও হাদিস-গ্রন্থে বর্ণিত "বনি কুরাইজা গণহত্যা পূর্ববর্তী" মুহাম্মদের নবী জীবনের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে মুহাম্মদের মনস্তত্ত্ব ও এই প্রশ্নের সঠিক জবাব আমরা অতি সহজেই নির্ধারণ করতে পারি।

বনি কুরাইজা গণহত্যা-পূর্ববর্তী মুহাম্মদের নবী-জীবনের ঘটনার সংক্ষিপ্তসার:

আদি উৎসে বর্ণিত বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই লিখিত মুহাম্মদের জীবনীগ্রন্থে মুহাম্মদের নবুয়ত পূর্ববর্তী ৪০ বছরের ঘটনার বর্ণনা যৎসামান্য। (পর্ব- ৪৫) ৪০বছর বয়সে একদিন মুহাম্মদ হেরা পর্বতের গুহা থেকে প্রত্যাবর্তন করে তাঁর স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুয়ালিদকে জানালেন যে, গুহায় অবস্থানকালে তিনি এক 'অলৌকিক অভিজ্ঞতার' সম্মুখীন হয়েছিলেন। মুহাম্মদের কাছ থেকে এই ঘটনাটি  শোনার পর খাদিজা মুহাম্মদকে অবহিত করান যে, মুহাম্মদ নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন ও ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফল বিন আসাদের কাছে গমন করেন এবং ঘটনাটি তাকে খুলে বলেন। ওয়ারাকা ছিলেন বাইবেল পণ্ডিত এক ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান। ঘটনাটি শুনে ওয়ারাকা খাদিজাকে জানান, "হে খাদিজা, যদি তুমি আমাকে সত্য বলে থাকো, মুহাম্মদের কাছে যে-এসেছিল, সে হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জিবরাইল। এর আগে মুসার কাছেও সে এসেছিল, জেনে রাখো, সে হলো এই জাতির নবী (If thou hast spoken to me the truth, O Khadija, there hath come on to him the greatest Namus (Tabari: 'meaning Gabriel') who came to Moses afore-time, and lo, he is the prophet of this people.--)।" [1]

অর্থাৎ মুহাম্মদ তাঁর সেই কথিত অলৌকিক উপলব্ধির ব্যাখ্যা ও কে তাঁর সাথে কথা বলেছিল, সে ব্যাপারে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অজ্ঞ। যে-ব্যক্তিটি তাঁকে তা জানান ও ঘোষণা দেন যে, "তিনি" একজন নবী, সে হলো খাদিজা। ওয়ারাকা বিন নওফল তা সমর্থন করেন ও অতিরিক্ত যে-তথ্যটি তিনি যোগ করেন, তা হলো - মুহাম্মদের কাছে যে সত্তাটির আগমন ঘটেছিল, সে ছিল "ফেরেশতা জিবরাইল"।

সোজা ভাষায়, "মুহাম্মদ যে একজন নবী" এই পরিচয়পত্রটি (Certificate) মুহাম্মদ পেয়েছিলেন খাদিজা ও ওয়ারাকার কল্যাণে। মুহাম্মদের "নবীযাত্রার শুরু" হয়েছিল এই দুই ব্যক্তির দেয়া পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে!

এই ঘটনার পর প্রায় তিন বছর যাবত মুহাম্মদ তার তথাকথিত 'নবুয়তের বাণী' প্রচার করেন গোপনে। অতঃপর তিনি প্রথমে তাঁর নিকট-আত্মীয়দের মধ্যে তাঁর তথাকথিত নবুয়তের বাণী প্রচারের জন্য আদেশপ্রাপ্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায়, তিনি তাঁর নিজেরই চাচা ও চাচীকে অভিশাপ বর্ষণ করেন!

অতঃপর মুহাম্মদ প্রকাশ্যে তাঁর প্রচারণা (পর্ব-১৬) শুরু করেন ও সুদীর্ঘ দশ বছর (৬১৩-৬২২ সাল) যাবৎ তিনি আল্লাহর নামে কুরাইশদের দেব-দেবী ও পূর্বপুরুষদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য-হুমকি-শাসানী-ভীতি-প্রদর্শন ও অসম্মান অব্যাহত রাখেন। (পর্ব: ২৬-২৭) আল্লাহর নামে তিনি তাঁকে অবিশ্বাসকারী ও তাঁর সমালোচনাকারীদের শোনাতে থাকেন 'পূর্ববর্তীদের উপকথা' (পর্ব: ১৭-১৯), উল্টাপাল্টা কথাবার্তা (পর্ব: ২০-২২), অবৈজ্ঞানিক উদ্ভট প্রলাপ ও যথেচ্ছ শাপ-অভিশাপের বার্তা (পর্ব: ১-১৩)।

মুহাম্মদের এহেন গর্হিত কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ কুরাইশরা মুহাম্মদের কাছে বহুবার বহুভাবে তাঁর নবুয়তের প্রমাণ হাজির করতে বলেন। তাঁদের দাবি বেশী কিছু ছিল না! তাঁরা মুহাম্মদের কাছে দাবী করেছিলেন যে, মুহাম্মদ যেন তাঁরই বর্ণিত পূর্ববর্তী নবীদের অনুরূপ কোনো একটি "মোজেজা (অলৌকিকত্ব)' তাঁদের সামানে হাজির করেন। মুহাম্মদ তা করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন। তাঁদের সেই ন্যায্য দাবির জবাবে তিনি তাঁদের সাথে করেন অবান্তর বাক্যবিনিময় ও আল্লাহর নামে নিজেই নিজের যথেচ্ছ ভূয়সী প্রশংসা, তাঁদেরকে করেন যথেচ্ছ হুমকি-শাসানী ও ভীতি প্রদর্শন! (পর্ব: ২৩-২৫)।

অতিষ্ঠ কুরাইশরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুহাম্মদ তাঁর ধর্মরক্ষার প্রয়োজনে তাঁর অনুসারীদের বিভিন্ন প্রলোভন ও হুমকির মাধ্যমে তাদের পরিবার ও পরিজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে প্রথমে আবিসিনিয়ায় ও পরবর্তীতে মদিনায় দেশান্তরিত (হিজরত) হতে বাধ্য করেন; মুহাম্মদ নিজেও তাঁর ধর্মরক্ষার প্রয়োজনে মদিনায় হিজরত করেন। (পর্ব: ৪১-৪২) মদিনায় আসার পর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা জীবনের এক কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হন। মদিনায় স্বেচ্ছানির্বাসনের সাত মাস পর জীবিকার প্রয়োজনে মুহাম্মদ ও তাঁর মক্কাবাসী অনুসারীরা (মুহাজির) 'ডাকাতি কর্মে' লিপ্ত হন। পর পর সাতটি ডাকাতি চেষ্টা হয় ব্যর্থ। (পর্ব: ২৮)।

অতঃপর একের পর এক উপর্যুপরি সাফল্য!

মুহাম্মদের আদেশে তাঁর অনুসারীরা নাখলা নামক স্থানে বাণিজ্য-ফেরত একজন নিরীহ কুরাইশকে খুন ও দুইজনকে বন্দী করে ধরে এনে তাদের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করেন। (পর্ব: ২৯)।

নাখলার এই নৃশংস ঘটনার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় বদর যুদ্ধ! (পর্ব: ৩০-৪৩) মুহাম্মদের আগ্রাসী আক্রমণ, খুন ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সর্বপ্রথম প্রতিরক্ষা যুদ্ধ। অধিকাংশ কুরাইশ গোত্রের যুদ্ধে অনিচ্ছা, মুহাম্মদ ও তাঁর সহচরদের প্রতি (যারা ছিল কুরাইশদেরই আত্মীয়-স্বজন) কুরাইশদের মানবিক দুর্বলতা ও কুরাইশদের প্রতি মুহাম্মদের দীক্ষায় দীক্ষিত নব্য মুসলমানদের সীমাহীন ঘৃণা, আক্রোশ ও অমানুষিক নৃশংসতায় এই যুদ্ধে মুহাম্মদের অপ্রত্যাশিত বিজয় ঘটে। (পর্ব- ৩৪) কিন্তু, মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে ঘোষণা দেন যে, এই সফলতার প্রকৃত কারণ হলো, তাঁদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ফেরেশতা মারফত সাহায্য, এবং তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে যারা তাঁর মতবাদে দীক্ষিত হবে, তাদেরকেই আল্লাহ এমনই ভাবে সাহায্য করবে।

বদর যুদ্ধের পর মুহাম্মদ তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনাকারী বেশ কিছু নিরস্ত্র মানুষকে খুনের আদেশ জারি করেন। তাঁর অনুসারী গুপ্ত ঘাতকরা রাতের অন্ধকারে এই সব নিরস্ত্র লোককে অমানুষিক নৃশংসতায় খুন করে। মুহাম্মদ এই খুনিদের ভূয়সী প্রশংসা করেন ও বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করেন। অতঃপর মুহাম্মদ বনি কেইনুকা গোত্রকে বিতাড়িত করে তাঁদের সমস্ত সম্পদ হস্তগত করেন। একের পর এক উপর্যুপরি সাফল্য ও গণিমতের মালের হিস্যায় উজ্জীবিত মুহাম্মদের অনুসারীরা তাদের নেতার প্রতি হন আরও বেশি অনুগত ও আস্থাশীল। মদিনায় হিজরতের পর একের পর এক এইসব সাফল্যের পরিচয়ে মুহাম্মদ অনুসারীদের বিশ্বাস হয় সুদৃঢ়, "মুহাম্মদের দাবি সত্য, তাঁর প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের প্রমাণ স্পষ্ট!" (পর্ব: ৪৬- ৫১)

মুহাম্মদ বনি কেইনুকা গোত্রের সমস্ত লোককে খুন করতে চেয়েছিলেন! তাঁদের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই নামের এক অসীম সাহসী আদি মদিনাবাসীর কল্যানে।

তারপর শুরু হলো একের পর এক উপর্যুপরি বিপর্যয়!

ওহুদ যুদ্ধে (মার্চ, ৬২৫ সাল) চরম বিপর্যয়:

>>> ওহুদ যুদ্ধে মুহাম্মদের চরম পরাজয় ও সমবয়সী চাচা হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব সহ ৭০ জন অনুসারীর নৃশংস খুন ও নবী-গৌরব ধূলিস্যাৎ! বিনষ্ট নবী-গৌরব পুনরুদ্ধার ও নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার কলা-কৌশলের অংশ হিসাবে মুহাম্মদের হামরা আল-আসাদ অভিযান ও আল্লাহর নামে কমপক্ষে ৬০ টি ঐশী বাণীর অবতারণার করে 'নিজেকে নির্দোষ ও বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁর অনুসারীদের উপর ন্যস্ত করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালান’! বিভিন্ন অজুহাতের মাধ্যমে তিনি এটিই প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ওহুদ যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ের জন্য তাঁর নেতৃত্ব কোনোভাবেই দায়ী নয়, দায়ী তাঁর অনুসারীদের ইমানের দুর্বলতা! সুতরাং তাঁর অনুসারীদের উচিত এই যে, তারা যেন তাদের সেই ইমানের দুর্বলতা স্বীকার করে নিয়েও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে। (পর্ব: ৬৮-৭০)।

'আল-রাজী', আবু-সুফিয়ানকে গুপ্তহত্যা চেষ্টা ও বীর মাউনার ব্যর্থতা:

>>> ওহুদ যুদ্ধের মাস তিনেক পর 'আল-রাজী' ও তার পরের ঘটনায় তাঁর আরও ছয়জন অনুসারীর নৃশংস খুন! তারপর আবু-সুফিয়ানকে গুপ্তহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থতা! তারপর বীর মাউনার বিষাদময় ঘটনায় তাঁর আরও ৪০-৭০ জন অনুসারীর নৃশংস খুন! তারপর আমর বিন উমাইয়া আল-দামরি কর্তৃক ভুলক্রমে বানু আমির গোত্রের দুইজন লোককে খুন ও তার খেসারতের (রক্ত-মূল্যের অর্থ) জোগাড়ের ব্যর্থতা। (পর্ব- ৭২-৭৪)

ওহুদ যুদ্ধের পর ছয়টি মাসের একের পর এক চরম বিপর্যয়ে নাস্তানাবুদ মুহাম্মদ পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁর অনুসারী ও প্রতিপক্ষের কাছে তাঁর শক্তিমত্তার নিদর্শন পেশ ও তাঁর অনুসারীদের পার্থিব সুযোগ-সুবিধার (গণিমত) ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন নিরপরাধ বনি নাদির গোত্রকে "জিবরাইলের অজুহাতে" জোরপূর্বক বিতাড়িত করার মাধ্যমে। খন্দক যুদ্ধের বছর দেড়েক আগে মুহাম্মদ কী অজুহাতে বনি নাদির গোত্রের সমস্ত মানুষকে তাঁদের শত শত বছরের মদিনার আবাসস্থল থেকে অমানুষিক নৃশংসতায় জোরপূর্বক বিতাড়িত করেছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা পর্ব: ৫২ ও ৭৫-এ করা হয়েছে। বনি নাদির গোত্রকে জোরপূর্বক বিতাড়িত ও তাঁদের সম্পদ লুণ্ঠনের হিস্যায় মুহাম্মদের অনুসারীরা হয়েছিলেন উজ্জীবিত এবং মুহাম্মদের হৃত গৌরব ও নেতৃত্ব হয়েছিল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত।

বনি কেইনুকা গোত্রের মত এবারেও মুহাম্মদ বনি নাদির গোত্রের সমস্ত লোককে খুন করতে চেয়েছিলেন! তাঁদের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল আবারও সেই একই আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কল্যাণে।

তারপর ধাতুল-রিকা ও দুমাতুল- জানদাল (Dumatul-Jandal) হামলায় ব্যর্থতা:

>>> বনি নাদির গোত্রকে উচ্ছেদের দুই মাস পর (অক্টোবর-নভেম্বর, ৬২৫ সাল) মুহাম্মদ ধাতুল-রিকা হামলা পরিচালনা করেন ও ঘাতাফান গোত্রের এক বড় দলের সম্মুখীন হয়ে ভীত হয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। এই অভিযানেই মুহাম্মদ প্রথম ভয় নামাজ (৪:১০২) সম্পাদন করেন। (পর্ব-৭৬)।

ধাতুল রিকা হামলার প্রায় আট মাস পর হিজরি ৫ সালের রবিউল আউয়াল মাসে (জুলাই, ৬২৬ সাল) মুহাম্মদ দুমাতুল- জানদাল হামলা পরিচালনা করেন। কোনোরূপ সংঘর্ষ ছাড়াই মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা বিফলকাম অবস্থায় মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। [2] [3] [4]

তারপর এই খন্দক যুদ্ধ! আবারও ব্যর্থতা!

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [5]  

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ৯৩) পর:

‘খন্দক যুদ্ধ ও বনি কুরাইজার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ সুরা আল-আহযাব (সুরা: ৩৩) নাজিল করে, যেখানে আল্লাহ বর্ণনা করেছে তাদের পরীক্ষা ও তার [আল্লাহর] দয়া ও সাহায্যের বিষয়ে:

[এর পর সিরাতে সুরা আল-আহযাবের ৩৩:৯ থেকে ৩৩:২৭ আয়াতের উল্লেখ। ৩৩:১০ থেকে ৩৩:১৭ আয়াতের আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। (পর্ব: ৮১)]

[৩৩:১৮-১৯] "আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে এস। তারা কমই যুদ্ধ করে।  [১৯] তারা তোমাদের প্রতি কুন্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মত চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। অতঃপর যখন বিপদ টলে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরীতে অবতীর্ণ হয়। তারা মুমিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিস্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।"       

[৩৩:২০] - "তারা মনে করে শক্রবাহিনী চলে যায়নি। যদি শক্রবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা গ্রামবাসীদের মধ্য থেকে তোমাদের সংবাদাদি জেনে নিত, তবেই ভাল হত। তারা তোমাদের মধ্যে অবস্থান করলেও যুদ্ধ সামান্যই করত।"

[৩৩:২১] - "যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।"

[৩৩:২২] - "যখন মুমিনরা শক্রবাহিনীকে দেখল, তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্নসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।"

[৩৩:২৩] - "মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।"

[৩৩:২৪-২৫]- "এটা এজন্য যাতে আল্লাহ, সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার কারণে প্রতিদান দেন এবং ইচ্ছা করলে মুনাফেকদেরকে শাস্তি দেন অথবা ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [২৫] আল্লাহ কাফেরদেরকে ক্রুদ্ধাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোন কল্যাণ পায়নি। যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ মুমিনদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে গেছেন। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।"’ [6] [7]

>>> মুহাম্মদের অধিকাংশ অনুসারী খন্দক যুদ্ধে (মার্চ, ৬২৭ সাল) কীরূপ অসহায় ও ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন, ওহুদ যুদ্ধের মতই খন্দক যুদ্ধেও মুহাম্মদের বহু অনুসারী কীভাবে মুহাম্মদের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছিলেন ও যথারীতি মুহাম্মদ "আল্লাহর নামে" তাদেরকে কীরূপে আনুগত্যহীন (মুনাফিক) ঘোষণা দিয়ে হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন করেছিলেন - তার সাক্ষ্য হয়ে আছে মুহাম্মদেরই স্বরচিত ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থের ওপরে উল্লেখিত আয়াতসমূহ, ‘সিরাত’ ও হাদিসের বর্ণনা। (পর্ব: ৭৭-৮৬)

ওপরে উল্লেখিত একের পর এক চরম ব্যর্থতা ও বিপর্যয় স্থানের কোথাও মুহাম্মদের প্রতিশ্রুত “আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ফেরেশতাদের সাহায্য" মুহাম্মদ অনুসারীদের কেউই প্রত্যক্ষ করেননি!

এমত অবস্থায় মুহাম্মদ অনুসারীদের মনোবল ও নবীর প্রতি তাঁদের আস্থা ক্রমান্বয়ে নিম্নগতিসম্পন্ন হতে বাধ্য। এই পরিস্থিতিতে এক প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষী দলপতি কীভাবে তাঁর অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?  শুধুমাত্র ইমানের দুর্বলতার অজুহাত ও বাগ্মিতার সাহায্যে অনুসারীদের যে খুব বেশি দিন আয়ত্তে রাখা যায় না, তা তীক্ষ্ণবুদ্ধির মুহাম্মদের অজানা থাকার কথা নয়। অনুসারীদের দলে ধরে রাখতে হলে নেতার সফলতা ও শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং অনুসারীদের পার্থিব সুখ-সচ্ছলতা ও সুযোগ-সুবিধার জোগান অপরিহার্য। একের পর এক চরম ব্যর্থতায় মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁদের নবীর উপর আস্থা হারাতে বাধ্য।
এমত পরিস্থিতিতে:
১) অনুসারীদের কাছে নিজের শক্তিমত্তার প্রমাণ উপস্থাপন করতে,
২) অনুসারীদের পার্থিব সুযোগ সুবিধার জোগান (গণিমত) নিশ্চিত করতে, ও
৩) “প্রয়োজনে ‘তিনি' কতটা নিষ্ঠুর হতে পারেন" এই বার্তা প্রতিপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে এক উচ্চাভিলাষী নৃশংস একনায়ক (Dictator) তার নৃশংসতার যে-উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন, মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ তাইই করেছিলেন। আর এই কুট উদ্দেশ্য সাধনের বাহন হিসাবে তিনি জিবরাইল-কে ব্যবহার করে “তাহারা কাফেরদের পৃষ্ঠপোষকতা করিয়াছিল'" অজুহাতটি হাজির করেন। (পর্ব: ৮৭)।

মুহাম্মদের ভাষায়,

৩৩:২৬ - কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফেরদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দূর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন। ফলে তোমরা একদলকে হত্যা করছ এবং একদলকে বন্দী করছ।

৩৩:২৭ - তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘর-বাড়ীর, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খন্ডের মালিক করে দিয়েছেন, যেখানে তোমরা অভিযান করনি। 

>>> অবিশ্বাসীরা মুহাম্মদ এবং তাঁর কোনো অনুসারীকে কোনোরূপ শারীরিক অত্যাচার করেছেন, কিংবা তাঁর কোনো অনুসারীকে খুন করেছেন, এমন উদাহরণ সমগ্র কুরানে একটিও নেই! কিন্তু মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা অমানুষিক ও সন্ত্রাসী কায়দায় কী রূপে অমুসলিমদের হামালা করেছিলেন, খুন করেছিলেন, নির্যাতন করেছিলেন (মুক্ত মানুষকে চিরদিনের জন্য বন্দী), তাঁদেরকে ভিটে মাটি থেকে উৎখাত করে তাঁদের যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি লুট করেছিলেন, তা মুহাম্মদ তাঁর নিজের জবানবন্দিতেই অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। বনি কেউনুকা ও বনি নাদির গোত্রের সমস্ত লোকদের "খুন করার অভিলাষ" মুহাম্মদ চরিতার্থ করতে পারেননি পরিস্থিতির কারণে। বনি কুরাইজা গণহত্যার মাধ্যমে মুহাম্মদ তাঁর সেই অভিলাষ চরিতার্থ করেছিলেন।

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হেরেম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা এখান থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে।] 


তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ১০৬-১০৭ http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৪৪৯

[3] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৪৬৩ http://books.google.com/books?id=sD8_ePcl1UoC&printsec=frontcover&source=gbs_ge_summary_r&cad=0#v=onepage&q&f=false

 [4] 'দুমাতুল-জানদাল - ওয়াদি সিরহান (Wadi Sirhan) এর সম্মুখ ভাগে অবস্থিত উত্তর আরবের এক মরূদ্যান। বানু কিনানা নামের বানু কালব গোত্রের এক উপগোত্র (Banu Kinanah subtribe of Banu Kalb) ও কিছু আরব খ্রিষ্টান এখানে বসবাস করতো। বর্তমান আল-জাউফ (al-Jawf) শহরটি এই স্থানে অবস্থিত।'

[5] Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ”, লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, পৃষ্ঠা ৪৬৬-৪৬৮

[6] ইবনে কাথিরের কুরান তফসির:

[7] তাফসীর যালালীন ও অন্যান্য: