২৬ জুলাই, ২০১৫

ইসলামী দেশের স্বপ্নদ্রষ্টারা

লিখেছেন পুতুল হক

ছয় বছর আগে বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে তালিকাভুক্ত শিবির কর্মী ছিল তিনজন। বর্তমানে সে সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে দুইশত তেপান্ন জনে। শুধু নামাজ পড়া বা রোজা রাখার জন্য কোনো ইসলামী দলের সমর্থক হতে হয় না। এরকম ধর্মীয় রাজনীতিক দলের সমর্থক বা কর্মী মানুষ তখনই হয়, যখন সে চায় সেই ধর্মের বিধিবিধান অনুসারে দেশ পরিচালিত হবে। ইসলাম যে ধর্মের খোলসে একটি রাজনৈতিক মতবাদ, সেটা মোটামুটি সবাই জানেন। কাজেই মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব এবং অধিকার শরিয়া অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা। এ বিষয়টি তাঁরা গোপন করে না।

মুহাম্মদ শুধুমাত্র একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবে দশ বছরেও যখন সফলতার মুখ দেখতে পারেনি, তখন সে মদিনায় হিজরত করে। সেখানে সে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতা এবং সম্পদের মালিক হয়। তারপরেই তার প্রচারিত ধর্ম প্রসার লাভ করতে থাকে। 

আমি আজকে সেসব নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আমাকে ভাবায় বাংলাদেশে প্রতি বছর শতকরা কত ভাগ হারে লোক বৃদ্ধি পাচ্ছে ইসলামী দেশের স্বপ্ন দেখার কাতারে? বাংলাদেশে শিক্ষার হার বাড়ছে (প্রকৃত শিক্ষা নাকি তথাকথিত শিক্ষা, সে আলোচনা নয়), বলা হয়। দেশে মোবাইল ফোন, টিভি মানুষের ঘরে ঘরে। প্রায় প্রতি স্তরের মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আধুনিক জীবনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হবার পরেও তবে কেন এ দেশের মানুষ ধর্মান্ধ রাজনীতির ফাঁদে পা দেয়?

বাবাদের কথা যখন ছোটবেলায় শুনেছি, তখনও দেশকে ইসলামী বাংলাদেশ করার কথা শুনিনি। মুসলমানের দেশে মদ খাওয়া হারাম, মসজিদ থাকবে নিয়মমাফিক - এটুকুই তাঁদের দাবি ছিল। বোরকা/হিজাব বা জোব্বা/টুপি নয়, বরং তাঁরা মেয়েদের বা ছেলেদের "মার্জিত পোশাক" বলতে দেশীয় পোশাককে বুঝিয়েছেন। অবশ্য প্রচলিত দেশীয় পোশাক যে নানান সময় এবং সংস্কৃতির মিলনে সংকর পোশাক, সেটা তাঁরা ভেবে বলেননি। সংস্কৃতি কিংবা জীবনাচার বুলেটপ্রুফ কাচ ঘেরা কোনো নরম বা দুর্বল বিষয় নয়। তার শেকড় প্রোথিত থাকে গভীরে। গ্রহণ-বর্জন তাতে পুষ্টি যোগায়, তাকে শক্তিশালী করে। এতে তার নিজস্বতা হারিয়ে যায় না।

বাংলা অঞ্চলে যখন ইসলাম এলো, তখন সে আরবের কঠোরতা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এ দেশের মানুষ রুক্ষ কঠিন ইসলামকে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে নিজের মত করে গড়ে নিয়েছিল। এখানে বাউল গান ছিল, হাসন রাজা ছিল, রবীন্দ্রনাথ ছিল। ছিল মনসার ভেলা, গাজী-কালু-চম্পাবতী। ধর্ম ছিল ইসলাম আর মানুষ ছিল বাঙালী। আজকে বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে মুসলমান হতে হচ্ছে। পূর্ব বা পশ্চিমের জীবনধারায় অভ্যস্ত থেকে কারো পক্ষে সম্ভব নয় পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়া।

পার্লারে এক পাহাড়ি মেয়ে কাজ করে, তাঁর নাম ফাতিমা। জিজ্ঞেস করেছিলাম, "তোমার এমন নাম কেন? তোমাদের আঞ্চলিক ভাষায় নাম রাখেনি কেন?" উত্তরে সে খুব জোরের সাথে বলেছিল, "মুসলমান মেয়েদের নাম এমনই হতে হয়।"

কিন্তু এতো কিছুর পরেও যে এসব "মাওয়ালি মুসলমান" প্রথম শ্রেণীর মুসলমান হতে পারবে না, এটা তাঁরা বুঝতে পারে না। ইসলাম যতটা না ধর্ম, তাঁর চাইতেও বেশী আরব জাতীয়তাবাদের প্রচার। ইসলামী শাসন মানে আরবের প্রথার স্বীকৃতি। আল্লাহ আরবের প্রভু। ভিন্ন জাতীয়তাবাদের জন্য সারা পৃথিবীর মুসলমান একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে।