৬ জুন, ২০১৫

খন্দক যুদ্ধ - ৪: বনি কুরাইজা গোত্রের ভূমিকা! কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ৮০): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – চুয়ান্ন

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ > পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩ > পর্ব ৬৪ > পর্ব ৬৫ > পর্ব ৬৬ > পর্ব ৬৭ > পর্ব ৬৮ > পর্ব ৬৯ > পর্ব ৭০ > পর্ব ৭১ > পর্ব ৭২ > পর্ব ৭৩ > পর্ব ৭৪ > পর্ব ৭৫ > পর্ব ৭৬ > পর্ব ৭৭ > পর্ব ৭৮ > পর্ব ৭৯

মক্কাবাসী কুরাইশদের সঙ্গে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীদের তৃতীয়/শেষ যুদ্ধটি (খন্দক যুদ্ধ) কী কারণে সম্পন্ন হয়েছিল; সালমান ফারসী নামের এক আদি পারস্যবাসী কীভাবে মুসলমান হয়েছিলেন ও তাঁর পরামর্শে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা মদিনার উত্তর দিকে কীভাবে খন্দক খনন করেছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা আগের তিনটি পর্বে করা হয়েছে। 

অন্তত: যে তিনটি কারণে খন্দক যুদ্ধটি বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী, তা হলো:

১) খন্দক খননের মাধ্যমে মুসলমানদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা; নেপথ্যের নায়ক সালমান ফারসী। মিত্রবাহিনীর কাছে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা, যাকে মোকাবেলা করার কোন প্রস্তুতিই তাদের ছিল না।

২) যুদ্ধক্ষেত্রে দু'পক্ষের সুসজ্জিত বিশাল সৈন্য বাহিনী সমবেত হওয়া সত্ত্বেও অতি অল্প সংখ্যক হতাহতের ঘটনার মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি

৩) যুদ্ধশেষে মুহাম্মদের নেতৃত্বে "বনি কুরাইজা গণহত্যা!"

আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনার আলোকে এই যুদ্ধে খননকৃত খন্দকটির অবস্থান, মুহাম্মদের নেতৃত্বে মুসলমান বাহিনীর অবস্থান, মিত্র বাহিনীর অবস্থান, বনি কুরাইজা ইহুদি গোত্রের অবস্থান এবং মদিনা ও তার চারপাশের ভৌগলিক পরিবেশের যে-চিত্র অংকিত হয়েছে তার বিস্তারিত আলোচনা পর্ব: ৭৮-এ করা হয়েছে।

আদি উৎসের বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট তা হলো:

খন্দকের বাধার কারণে মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা ‘সদলবলে’ মুসলমান বাহিনীকে সরাসরি আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু, মিত্রবাহিনী ও মুসলমান বাহিনীর কিছু সদস্য ‘এককভাবে’ খন্দক অতিক্রম করে এপার-ওপার যোগাযোগ করেছিলেন।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1] [2]

আল্লাহর শত্রু হুয়েই বিন আখতাব আল-নাদরি; কাব বিন আসাদ আল-কুরাজির নিকট আসে, যে আল্লাহর নবীর সাথে এক চুক্তিপত্র সম্পাদন করেছিল।

(আল-তাবারী: 'আল্লাহর শত্রু হুয়েই বিন আখতাব কাব বিন আসাদ আল-কুরাজির নিকট আসে, যার কাছে ছিল বানু কুরাইজার চুক্তি ও অঙ্গীকারপত্র। কাব তার লোকজনের পক্ষে আল্লাহর নবীর সাথে এক সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি (Truce) করেছিল, চুক্তিপত্র সম্পাদনের মাধ্যমে সে তাঁর সাথে অঙ্গীকারে আবদ্ধ ছিল।)

যখন কাব শুনতে পায় যে, হুয়েই তার কাছে আসছে, সে তার মুখের ওপরই দুর্গের দরজা বন্ধ করে দেয়।

যখন সে ভেতরে ঢোকার অনুমতি প্রার্থনা করে, তখন সে তার সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে ও বলে যে, সে অলুক্ষণে, মুহাম্মদের সাথে চুক্তিপত্রের সময় সে নিজে ছিল উপস্থিত, সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার কোনো অভিপ্রায়ই তার নেই, কারণ সে সর্বদাই তাঁকে অনুগত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিরূপে দেখেছে।

তখন হুয়েই তাকে এই বলে অভিযুক্ত করে যে, সে তাকে তার ভুট্টা (তাবারী: 'জইয়ের মণ্ড’) খেতে দিতে চায় না বলেই দরজা বন্ধ করে তাকে বাহিরে রেখেছে। এতে সে এতই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যে, সে তার দুর্গের দরজা খুলে দেয়।

সে বলে, "সুসংবাদ, কাব, আমি তোমার কীর্তি অমর (immortal fame) করার নিমিত্তে এক বিরাট সেনাবাহিনী সঙ্গে এনেছি। আমি কুরাইশ বাহিনী ও তাদের নেতাদের সাথে এসেছি, যে-স্থানটিতে রুমার জলস্রোত প্রবাহিত সেখানে এসে তাদের থামিয়েছি; ঘাতাফান বাহিনী ও তাদের নেতাদের আমি থামিয়েছি ওহুদের দিকে ধানাব নাকমা নামক স্থানে। তাদের সাথে আমার এক দৃঢ় চুক্তি (firm agreement) হয়েছে এবং তারা আমার সাথে এই বলে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, আমরা মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের শেষ না দেখে ফিরে যাব না।" [3]

কাব বলে, "আল্লাহর কসম, তুমি আমার জন্যে এনেছ এক চিরস্থায়ী-লজ্জা (immortal shame) এবং এক অন্তঃসারশূন্য মেঘমালা, যে তার পানি খালি করা অবস্থায় গর্জায় ও চমকায়, ও যার ভেতরে কিছুই অবশিষ্ট নেই। হে হুয়েই, ধিক্ তোমাকে, আমাকে (তাবারী: 'ও মুহাম্মদ কে') ত্যক্ত করো না, কারণ আমি তাঁকে সর্বদাই অনুগত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিরূপে দেখেছি।"

হুয়েই কাব-কে ভুলানোর চেষ্টা করতেই থাকে, যতক্ষণে না সে হাল ছেড়ে দেয়, যখন হুয়েই তাকে এই বলে প্রতিশ্রুতি দান করে যে, যদি কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদকে হত্যা না করেই প্রত্যাবর্তন করে, তবে সে কাবের দুর্গে প্রবেশ করে তার সাথে থাকবে ও পরিণতির জন্য অপেক্ষা করবে।

এইভাবে কাব তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এবং তার ও আল্লাহর নবীর মধ্যে যে-চুক্তি ছিল, তা ছিন্ন করে।

(আল-তাবারী: 'কিন্তু হুয়েই কাব কে ভুলানোর চেষ্টা করতেই থাকে যতক্ষণে না সে তার কাছে হার মানে, যখন হুয়েই তাকে আল্লাহর শপথ করে প্রতিজ্ঞা করে এই বলে যে, "যদি কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদকে হত্যা না করেই প্রত্যাবর্তন করে তবে তোমার দুর্গে আমি তোমার সঙ্গে প্রবেশ করবো; যাতে তোমার যে পরিণতি হবে, আমারও হবে তেমনই।" তখন কাব বিন আসাদ তার চুক্তি ভঙ্গ করে এবং তার ও আল্লাহর নবীর সাথে যে লিখিত প্রতিশ্রুতি ছিল তা অস্বীকার করে।')

যখন আল্লাহর নবী ও মুসলমানেরা এই খবর শুনতে পান; তখন আল্লাহর নবী বানু আল-হারিথা বিন আল-খাযরায গোত্রের আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা নামের এক ভাই ও খাওয়াত বিন যুবায়ের নামের বানু আমর বিন আউফ গোত্রের আর এক ভাইকে সঙ্গে দিয়ে সেই সময়ের আউস গোত্র প্রধান সা'দ বিন মুয়াধ বিন আল নুমান ও বানু সা'য়েদা বিন কাব বিন খাযরায গোত্রের সেই সময়ের আল-খাযরায গোত্র প্রধান সা'দ বিন উবাদা বিন দুলায়েম-কে এই খবরের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য সেখানে পাঠান। তিনি তাদেরকে বলেন, 

"যদি ঘটনাটি সত্য হয়, তবে সেই খবরটি আমাকে হেঁয়ালিপূর্ণভাবে এমনভাবে জানাবে, যা আমি বুঝতে পারি, কিন্তু জনগণের প্রত্যয় হারাবার কারণ না হয়। আর যদি তারা তাদের চুক্তির প্রতি হয় বিশ্বস্ত, তবে তা তোমরা সবার সামনে খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করবে।"[4] [5]

তারা সেখানে গমন করে ও দেখে যে, তারা যা শুনেছিল তার চেয়ে অবস্থা আরও শোচনীয়।

তারা আল্লাহর নবী সম্বন্ধে অপমানজনক উক্তি করে ও বলে, "কে এই আল্লাহর নবী? মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোনোই চুক্তি বা অঙ্গীকার নেই।"

সা'দ বিন মুয়াধ তাদেরকে গালাগালি করে, তারাও তাকে গালাগালি করে। সে [সা'দ বিন মুয়াধ] ছিল হঠকারী মেজাজের লোক। সা'দ বিন উবাদা তাকে বলে, "তাদেরকে অপমান করা বন্ধ করো, কারণ তাদের ও আমাদের মধ্যের দ্বন্দ্ব এতই গুরুতর যে, তা কোনো পাল্টা অভিযোগের বিষয় নয়।"

তারপর এই দুই সা'দ আল্লাহর নবীর কাছে ফিরে আসে ও তাঁকে সালাম করার পর বলে, "আদাল ও আল-কারা", অর্থাৎ, (এটি) আল-রাজীতে খুবায়েব ও তার বন্ধুদের সাথে আদাল ও আল-কারার বিশ্বাসঘাতকতার মতই একটি ঘটনা। [পর্ব: ৭২]

আল্লাহর নবী বলেন, "আল্লাহু আকবার! Be of good cheer, you Muslims.”

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি। - অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ - লেখক।]

Resumption of the narrative of Ibne Ishaq (704-768 A.D): [1] [2]

The enemy of God Huyayy b. Akhtab al-Nadri went out to Ka'b b. Asad al-Qurazi who had made a treaty with the apostle.

(Al-Tabari: ‘The enemy of God Huyayy b. Akhtab went out and came to Ka'b b. Asad al-Qurazi, who was the possessor of the treaty and covenant of the Banu Qurayza. Kab had made a truce with the messenger of God for his people, making a contract and covenanting with him on it’.)  

When Ka'b heard of Huyayy's coming he shut the door of his fort in his face, and when he asked permission to enter he refused to see him, saying that he was a man of ill omen and that he himself was in treaty with Muhammad and did not intend to go back on his word because he had always found him loyal and faithful. 

Then Huyayy accused him of shutting him out because he was unwilling to let him eat his corn.  This so enraged him that he opened his door. 

He said 'Good heavens, Ka'b, I have brought you immortal fame and a great army.  I have come with Quraysh with their leaders and chiefs which I have halted where the torrent-beds of Ruma meet; and Ghatafan with their leaders and chiefs which I have halted in Dhanab Naqma towards Uhud.  They have made a firm agreement and promised me that they will not depart until we have made an end of Muhammad and his men.' [3]

Ka'b said: 'By God, you have brought me immortal shame and an empty cloud which has shed its water while it thunders and lightens with nothing in it. Woe to you Huyayy leave me (Tabari: and Muhammad) as I am, for I have always found him loyal and faithful.' 

Huyayy kept on wheedling Ka'b until at last he gave way in giving him a solemn promise that if Quraysh and Ghatafan returned without having killed Muhammad he would enter his fort with him and await his fate. 

Thus Ka'b broke his promise and cut loose from the bond that was between him and the apostle.

(Al-Tabari: ‘But Huyayy kept wheedling Kab until he yielded to him, Huyayy having given him a promise and oath by God that, “if Quraysh and Ghatafan retreat without having killed Muhammad, I will enter yor fortress with you, so that whatever happens to you shall happen to me.” So Kab bin Asad broke his treaty and renounced the bond that had existed between him and the Messenger of God.’)

When the apostle and the Muslims heard of this the apostle sent Sa'b b. Mu'adh b. al Nu'man who was chief of Aus at the time, and Sa'd b. 'Ubada b. Dulaym, one of B. Sa'ida b. Ka'b b. Khazraj, chief of al-Khazraj at the time, together with 'Abdullah b. Rawaha brother of B. al-Harith b. al-Khazraj, and Khawwat b. Jubayr brother of B. 'Amr b. 'Auf, and told them to go and see whether the report was true or not.  [4] [5]

'If it is true give me an enigmatic message which I can understand, and not undermine the people's confidence; and if they are loyal to their agreement speak out openly before the people.'
They went forth and found the situation even more deplorable than they had heard;

they spoke disparagingly of the apostle, saying, 'Who is the apostle of God? We have no agreement or undertaking with Muhammad.'

Sa'd b. Mu'adh reviled them and they reviled him. He was a man of hasty temper and Sa'd b. 'Ubada said to him, 'Stop insulting them, for the dispute between us is too serious for recrimination.'

Then the two Sa'ds returned to the apostle and after saluting him said:

"Adal and al-Qara' i.e. (It is) like the treachery of 'Adal and al-Qara towards the men of al-Raji', Khubayb and his friends. (v.s.)

The apostle said 'Allah akbar! Be of good cheer, you Muslims.'

>>> বনি কুরাইজার নৃশংস গণহত্যার ন্যায্যতার সপক্ষে মুহাম্মদ অনুসারী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা গত ১৪০০ বছর যাবত যে-অভিযোগ (অজুহাত) পেশ করে আসছেন, তা হলো, বনি কুরাইজার লোকেরা চুক্তি ভঙ্গ করে মিত্রবাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন

তাঁদের এই দাবির উৎস হলো আদি উৎসে লিখিত ইসলামে নিবেদিতপ্রাণ বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের লিখিত ওপরে উল্লেখিত ২০-২৫ লাইনের বর্ণনা! এই বর্ণনাটিকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মুহাম্মদ অনুসারী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা "বনি কুরাইজার গণহত্যার" ন্যায্যতা প্রদান করে চলেছেন।

ঘটনার বিবরণে আমরা জানছি:

১) মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা “শুনতে পান” যে, তাদের মারফত জোরপূর্বক মদিনা থেকে বিতাড়িত বনি নাদির গোত্রের নেতা হুয়েই বিন আখতাব, বনি কুরাইজা গোত্রের নেতা কাব বিন আসাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন ও হুয়েইয়ের প্ররোচনায় কাব 'চুক্তিভঙ্গ' করেছেন। “কে তাদের এই খবরটি জানিয়েছে?” এ ব্যাপারে কোনো তথ্য এই উপাখ্যানের কোথাও নেই। 

২) হুয়েই বিন আখতাব ছিলেন সেই সব লোকদের একজন, যারা কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের কাছে গিয়েছিলেন ও তাদেরকে এই বলে আমন্ত্রণ করেছিলেন যে, তারা যেন তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালায়, যাতে তারা সকলেই মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের আগ্রাসী আক্রমণ থেকে সর্বাংশে মুক্তি পেতে পারেন। (পর্ব- ৭৭)

৩) হুয়েই বিন আখতাব ও কাব বিন আসাদের এই সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের “কোনো প্রত্যক্ষদর্শী (Eye witness) ছিলেন”, এমন কোনো আভাস এই বর্ণনার কোথাও নেই। যুদ্ধের ঐ পরিস্থিতিতে যদি কোনো মুহাম্মদ অনুসারী “মুহাম্মদ/আল্লাহর শত্রু” এই হুয়েই বিন আখতাবকে বনি কুরাইজার নেতার সাথে চাক্ষুস দেখতেন, তবে হুয়েই যে অক্ষত অবস্থায় ফিরে যেতে পারতেন না, তা শতভাগ নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। 

৪) ওপরে উল্লেখিত উপাখ্যান যদি "শতভাগ সত্য হয়" (পর্ব- ৪৪), তবে এই বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো, বনি কুরাইজার এই নেতা যখন শুনতে পান যে, হুয়েই তার সাথে দেখা করতে আসছেন তখন:

ক) তিনি হুয়েই-এর মুখের ওপরই তাঁর দুর্গের দরজা বন্ধ করে দেন;
খ) তিনি হুয়েই-কে ভেতরে ঢোকার অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন;
গ) এমনকি তিনি তাঁর সাথে দেখা করতেও অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন।
ঘ) তিনি তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন যে, চুক্তি ভঙ্গ করার কোনো অভিপ্রায়ই তাঁর নেই!

তারপর,

৫) হুয়েইয়ের অসম্মানজনক উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ("অতিথিকে খেতে দেয়ার ভয়ে বাড়ির দরজা বন্ধ করে রাখা') পর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি তাঁর দুর্গের দরজা খুলে দেন ও হুয়েইয়ের প্রচণ্ড জেদাজেদির কারণে তিনি "হাল ছেড়ে দেন!"

এই বিষয়টিকেই মুহাম্মদ ইবনে ইশাক "এইভাবে কাব তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে" বলে আখ্যায়িত করেছেন।

অতঃপর,

৬) মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা এই খবরটি "শুনতে পান।" খবরটি শুনে মুহাম্মদ চারজন লোককে এই ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য সেখানে পাঠান; তারা সেখানে গিয়ে দেখে যে তারা যা শুনেছিল তার চেয়ে "অবস্থা আরও শোচনীয়।"

“কী ভাবে তারা বুঝেছিলেন যে অবস্থা আরও শোচনীয়"?

বলা হচ্ছে, 'তারা আল্লাহর নবী সম্বন্ধে অপমানজনক উক্তি করে ও বলে, "কে এই আল্লাহর নবী? মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোনোই চুক্তি বা অঙ্গীকার নেই।"'

এ এক অত্যাশ্চর্য বর্ণনা!

কারণ?

কারণটি হলো, "খন্দক যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র!" 

সেই মানচিত্রটির দিকে আর একবার মনোনিবেশ করা যাক (পর্ব: ৭৮):


খন্দক যুদ্ধ ক্ষেত্রের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো:

"মিত্র বাহিনীর অবস্থান খন্দকের ওপারে, তারা খন্দক অতিক্রমে ব্যর্থ। এমতাবস্থায়, ইচ্ছা করলেও তারা বনি কুরাইজা গোত্রকে সৈন্যবলে সাহায্য করতে অসমর্থ।"

আদি উৎসের বর্ণনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে, মদিনায় অবস্থিত সম্পদশালী তিনটি বড় ইহুদি গোত্রের দু'টিকে অনেক আগেই মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা জোরপূর্বক বিতাড়িত করে তাঁদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করেছেন।

আমরা আরও জেনেছি যে, যদি আবদুল্লাহ বিন উবাই ও তাঁর অনুসারীরা হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে বনি কেউনুকা ও বনি নাদির গোত্রের সমস্ত মানুষকে মুহাম্মদ ও তাঁর অন্যান্য অনুসারীরা হত্যা করতেন। (পর্ব: ৫১, ৫২ ও ৭৫)

এমনই এক প্রেক্ষাপটে,

“মিত্র-বাহিনীর কাছ থেকে কোনরূপ সাহায্যের সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও;
মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের অসম্মান অথবা বিরুদ্ধাচরণ করার ভয়াবহ নৃশংস পরিণতি চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও";

বনি কুরাইজার এই নেতা তাঁর ৬০০- ৯০০ জন জনবল নিয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর তিন হাজার সুসজ্জিত অনুসারীর একেবারে নাগালের মধ্যে অবস্থান করে, “মুহাম্মদের অনুসারীদেরই সামনে মুহাম্মদের অসম্মান ও তাঁর অনুসারীদের গালাগালি করে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ‘চুক্তিপত্র’ ছিন্ন করেছিলেন” - এমন একটি বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?

নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এমন নাটকীয় "চুক্তিভঙ্গ” ও ছিন্ন করার কিচ্ছা যুক্তির বিচারে একেবারেই অবাস্তব। বনি কুরাইজা যদি সত্যিই মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতেন, তবে তাঁরা তা করতেন গোপনে; প্রকাশ্যে নয়!”

>>> ইসলামের ইতিহাসে “মদিনা সনদ" নামক চুক্তিশর্তটি ছাড়া মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের সাথে মদিনাবাসী ইহুদিরা অন্য কোনো চুক্তিশর্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, এমন কোনো চুক্তির অস্তিত্ব আদি উৎসে বর্ণিত সিরাত ও হাদিসের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

সুতরাং, বনি কুরাইজার এই তথাকথিত চুক্তিভঙ্গ যে “মদিনা সনদ” নামের চুক্তিভঙ্গের অপবাদ, তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

আর “মদিনা সনদ" চুক্তির অস্তিত্ব কী কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ও এই তথাকথিত শান্তি চুক্তির উপাখ্যান যদি শতভাগ সত্যও হয়, তথাপি এই চুক্তি পত্রে উল্লেখিত শর্তাবলী বহু পূর্বেই "মুহাম্মদ স্বয়ং" কীভাবে ভঙ্গ করেছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা ‘মদিনা সনদ তত্ত্ব’ পর্বে করা হয়েছে (পর্ব: ৫৩)।

আর, “বনি কুরাইজার লোকেরা মিত্রবাহিনীকে সাহায্য করিয়াছিল!, এমন একটি দাবির  সপক্ষে প্রমাণ অবশ্য আবশ্যক! এটি একটি নৃশংস গণহত্যার তদন্ত! সুনির্দিষ্ট চাক্ষুস প্রমাণ অত্যাবশ্যক!

বনি কুরাইজা গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের কোনোরূপ আক্রমণ-চেষ্টা কিংবা হত্যাচেষ্টা করেছিলেন; কিংবা তাঁরা মিত্রবাহিনীকে কোনোরূপ সাহায্য-চেষ্টা, কিংবা, ন্যূনতম পক্ষে তাদের সাথে সক্রিয়ভাবে কোনোরূপ যোগাযোগ-চেষ্টা করেছিলেন; এমন একটি দৃষ্টান্তও আদি উৎসের বর্ণনার কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।  

গণহত্যা একটি মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ!

তা সে যেইই সংঘটিত করুক না কেন, যে নামেই সংঘটিত হোক না কেন! মানব ইতিহাসে যুগে যুগে বহু নৃশংস গণহত্যা ঘটেছে, ভবিষ্যতেও হয়তো তা ঘটবে। ঐ সব গণহত্যার নায়কদের নাম আজ ইতিহাসের পাতায়, মহাকালের আস্তাকুঁড়ে! আজকের পৃথিবীর কোনো মানুষই প্রকাশ্য জনসম্মুখে সেই নায়কদের 'সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব' হিসাবে ভূষিত করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেন না।

একমাত্র ব্যতিক্রম,

মুহাম্মদ ও তাঁর নিবেদিতপ্রাণ অনুসারীরা!

৬২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, বনি কুরাইজার সেই ভয়াবহ হৃদয়বিদারক অমানুষিক নৃশংস গণহত্যার (পর্ব: ১২) নায়ক হওয়া সত্ত্বেও, আজকের পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ প্রকৃত ইতিহাস জেনে অথবা না জেনে (অধিকাংশ জনগণই এই দলে) মুহাম্মদকে 'সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব' হিসাবে ভূষিত করে তাঁর ভাবাদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার ব্রতে ব্রতী। ইসলামে নিবেদিতপ্রাণ এই অনুসারীদের অমানবিক নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর মানুষ আজ আতঙ্কিত। এমনটি না হলে, এই লেখার কোনো প্রয়োজনই ছিল না (পর্ব: ২৯ ও ১০)

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৪৫৩

[2] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৪৭১-১৪৭৩

[3] ‘রুমার জলস্রোত প্রবাহিত [জাঘাবা (Zaghaba/al-Ghaba)] - মদিনা থেকে আট মাইল দূরবর্তী একটি স্থান। [পর্ব: ৭৮]

[4] আল-আউস ও আল-খাযরায গোত্র ছিল তৎকালীন মদিনায় ইহুদীদের বিপরীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি আরব গোত্র। [পর্ব: ৫০]।

[5] আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা ছিলেন তার গোত্রের একজন নেতা ও কবি। তিনি ছিলেন মদিনার সেই লোকদের একজন যিনি 'হিজরতের' এক বছর আগে "দ্বিতীয় আকাবা-য়" মুহাম্মদের আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন। তিনি বদর, ওহুদ ও খন্দক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। হিজরি ৮ সালে মুতার যুদ্ধে তিনি নিহত হন।