২৮ জুন, ২০১৫

পবিত্র রমজান এবং ভবঘুরের প্রশ্নবাণ

লিখেছেন ভবঘুরে বিদ্রোহী

রোযা বা রোজা (ফার্সি روزہ রুজ়ে), সাউম (আরবি صوم স্বাউম্‌), বা সিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়। সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকার নামই রোযা বা সাওম। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের শান্তিবাদী ইসলাম ধর্মমতে - মাহে রমজান বা হিজরী রামাদান চান্দ্রমাস চলছে, ইসলামী মতে পূর্ণবয়স্ক সুস্থ-সবল ধনী-দরিদ্র সকল নর-নারীর ওপর নামাজের মতো রোজাও (فرض ফ়ার্দ্ব্‌) অবশ্যপালনীয় ফরজ। সুর্যোদয়ের আগ থেকে সুর্যাস্তের পর পর্যন্ত সারাদিন অভুক্ত থেকে সংযম পালন করতে হয়, আকাশে সুর্য থাকা অবস্থায় খাদ্য, পানীয়, ধুম্র গ্রহণ বা গলধঃকরন সম্পূর্ণ নিষেধ।

রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: “রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী।” (সূরা বাকারা : ১৮৫) রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম (সাঃ)-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে, জগতের সকল জ্ঞানের একমাত্র আধার কুরান মজিদ নাজিল হওয়ার মধ্য দিয়েই মোহাম্মদকে সর্বজ্ঞানী, আল্লার প্রেরিত মহানবী ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে, তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। এই মহীমান্বিত মাসে শয়তান বন্দী থাকে বলে কাউকে প্ররোচিত করতে পারে না, কেউ কোনো অপরাধ করলে নিজ থেকেই করে, তাই এ মাসে সকল প্রকার পাপকার্য থেকে পানাহারের মতোই নিজ থেকেই সকলে বিরত থাকে।

রোজাদারের অভুক্ত মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরী অপেক্ষাও অধিক প্রিয়, এমনকি রোজাদারের পুরস্কার আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন বলেও কোরানে অঙ্গীকারাবদ্ধ, নিশ্চয় আল্লাহ ভঙ্গ করে না অঙ্গীকার। ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম, যা পৃথিবীর সকল কওমের সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং অবশ্যপালনীয়, আল্লাহ সকলের জন্য সমান করুণাময়, দয়াশীল, সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ, সর্বগ, সর্বশক্তিমান, সর্বোৎকৃষ্ট বিচারকর্তা এবং সুমহান। আল্লাহু আকবার।

এমন ফযিলতের মাস, রহমতের মাসের মাহাত্ম্য শুনতে শুনতে এতোটাই ভালো লাগে যে, তার গুরুত্ত্ব আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের কাছেই প্রাধান্য থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাই তারা প্রমাণ অসাধ্য রোযা নিজেরা রাখুক বা না রাখুক, অন্যকে পালন করাতে যথাতৎপর, এমনকি কিছুক্ষেত্রে বিধর্মী, অধার্মিক, শিশু-বৃদ্ধ কিংবা রোগীর কথাও চিন্তা না করে পাড়ার খাবার দোকান বা হোটেল-রেস্তোরা জোর করেই বন্ধ করে দেয়, যদিও তারা পাড়া ছেড়ে পাঁচতারা মার্কা হোটেলের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই রোজা কি পৃথিবীর সকল সুস্থ-সবল পূর্ণবয়স্ক সকল মানুষের জন্য আসলেই সমানভাবে প্রযোজ্য বা পালনীয় হওয়া সম্ভব? গোলাকার পৃথিবীর সর্বত্র দিবা-রাত্র কি আদৌ সমান? তাহলে....

আইসল্যান্ডে এবার সেহরি খেতে হচ্ছে রাত দু’টোয় আর ইফতার হয় পরের দিন রাত ১২ টায় ৷ সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত ২২ ঘণ্টার ব্যবধান। আর সবচেয়ে অল্প সময়ের রোজা হচ্ছে চিলিতে। সেখানে বৃহস্পতিবার রোজার সময় ছিল মাত্র ৯ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। বাংলাদেশে প্রথম রোজার সময় ছিল ১৫ ঘণ্টা ০৪ মিনিট। আইসল্যান্ডে মাত্র ৭৭০ জন মুসলমানের বাস। তবে এই ৭৭০ জনের মধ্যে যাঁরা পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনা করেন, তাঁরা এক দিক থেকে বিশ্বের আর সমস্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে ছাড়িয়ে যান। তেমনি আরও কিছু দীর্ঘ রোজার দেশের হালচিত্র নিম্নে দেয়া হলো। যেমন:

সুইডেন – ২০ ঘণ্টা: খুব গরমের মধ্যে রোজা হলে সুইডেনের মুসলমানদেরও কষ্টের সীমা থাকে না। দেশটির ৫ লাখ মুসলমানের মধ্যে যাঁরা রোজা রাখেন, তাঁদের ইফতারের মাত্র চার ঘণ্টা পরই সেহরি খেতে হয়। উল্টো দিক থেকে ভাবলে কষ্টটা বুঝতে পারবেন। সুইডেনের মুসলমানদের অনেক দিন সেহরির ২০ ঘণ্টা পর ইফতার খেতে হয়৷

আলাস্কা – ১৯ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট: যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ৩ হাজার মুসলমান। গ্রীষ্মকালে ভীষণ গরম থাকে সেখানে। তার ওপর কোনো কোনোদিন সূর্যোদয়ের ১৯ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর সূর্য ডোবে। এত লম্বা সময় ধরে রোজা রাখা তাই অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না৷

জার্মানি – ১৯ ঘণ্টা: রমজান মাসের সময় দিন খুব বড় হলে জার্মানির মুসলমানদেরও রোজা রাখতে ভীষণ কষ্ট হয়। এ বছর জার্মানিতে সব ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে সেহরি খেতে হচ্ছে রাত সাড়ে তিনটায় আর ইফতার রাত দশটায়।

কানাডা – ১৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা: এখন প্রায় ১০ লক্ষ মুসলমান আছে কানাডায়। সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বাস টরন্টোতে। এবার কোনো কোনো দিন সেহরির প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর ইফতারি খেতে হবে তাঁদের।

তুরস্ক – সাড়ে ১৭ ঘণ্টা: মুসলিমপ্রধান দেশ তুরস্কেও গরমকালে রোজা রাখতে হয় খুব কষ্ট করে। এবার সেহরির প্রায় সাড়ে ১৭ ঘণ্টা পর ইফতার করতে হচ্ছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের।

ইংল্যান্ড – ১৮ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট: ইংল্যান্ডে সেহরি থেকে ইফতারের সময়ের পার্থক্য প্রায় ২০ ঘণ্টা। রমজান শুরুর আগেই তাই 'মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেন' নামের একটি সংগঠন এত দীর্ঘ সময়ের রোজা রাখার আগে ভেবে দেখতে বলেছে। সংগঠনটির আশঙ্কা, এতো লম্বা সময় রোজা রাখলে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। বিশেষ করে ডায়বেটিসে আক্রান্তদের প্রাণহানির শঙ্কাও দেখা দিতে পারে। ব্রিটেনে এখন প্রায় ২৭ লক্ষ মুসলমান আছে। এর মধ্যে ৩ লক্ষ ২৫ হাজারই ডায়বেটিসে আক্রান্ত।

যাদের ডায়াবেটিসের সমস্যা আছে, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা, ওষুধ, খাদ্য ব্যবস্থার এবং জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়। তবে রোজার সময় ১৬-১৭ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হয়। এখানে চার রকমের সমস্যা হতে পারে। যার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই, তার রক্তের শর্করা বেড়ে যেতে পারে। অথবা কারো কারো ক্ষেত্রে ইফতারের আগে বিশেষ করে আসরের পরে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তের শর্করার স্বল্পতার কারণে তারা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। শরীরে পানির ধারণক্ষমতা কমে যাবে। কারণ রোজার সময়তো পানিও খেতে পারছে না। এতে স্বাস্থ্য হুমকিতে পড়বে। অথবা আরো মারাত্মক হলো রক্তে শর্করার সাথে সাথে লবণ এবং অন্যান্য জিনিসের পরিবর্তন হয়ে ডায়াবেটিক কেটোয়েসিডোসিস -এর মতো মারাত্মক ধরনের সমস্যা আক্রান্ত হতে পারে।

না, মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের সময়োচিত দাবিতে ইংল্যান্ডের মুলধারার মুসলিমেরা সাড়া দেয়নি। বরং তারা প্রতিবাদে জানিয়েছে আকাশে সুর্য থাকা অবস্থায় কোনোভাবেই পানাহার করা যাবে, সেটা হবে কোরানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। রোযা ফার্সি শব্দ, যার অর্থ দিন, সুতরাং অনাহারে একদিন পূর্ণ করতেই হবে, ইসলাম ভিন্ন কোনো ফিরকার সাথে আপোস করে না।

এবার আসি গোলাকার পৃথিবীর আরেক অঞ্চলের আলোচনায়, এই যেমন নিশীথ সূর্যের দেশ হিসেবে খ্যাত বা পৃথিবীর উত্তর মেরুর যেসব দেশে গ্রীষ্মকালে কখনোই সূর্য ডোবে না, সেখানকার মুসলমানরা কীভাবে রোজা রাখেন? রমজান মাস যেহেতু চন্দ্রপঞ্জিকার ওপর নির্ভর করে চলে, তাই কয়েক বছর পরপরই ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে রোজা শুরু হয়। এ বছরের মতো বিদায়ী গ্রীষ্মে সর্বশেষ রোজা শুরু হয়েছিল প্রায় পয়ঁত্রিশ বছর আগে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তবে সে সময় এমন প্রশ্নের সম্মুখিন কাউকে হতে হয়নি, কারণ ওই সময় উত্তর মেরুর দেশগুলোতে মুসলমানদের খুব একটা বসবাস ছিল না। নব্বই দশকের শুরু থেকেই সোমালিয়া, ইরাক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের মতো উত্তর মেরুর দেশগুলোতে অভিবাসী হতে থাকে। এ দেশগুলোর কিছু অঞ্চলে বছরের প্রায় ছয় মাস কখনোই সূর্য অস্ত যায় না। এর ফলে দেশগুলোতে বর্তমানে অবস্থানরত মুসলিমদের রোজা পালন নিয়ে একটি নির্মম বাস্তবতা ও নৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ওখানকার মুসলমানরা তাহলে কীভাবে রোজা রাখছেন?

সম্প্রতি এমনই কিছু সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইন্দোনেশিয়ার এক সাংবাদিক নরওয়ের সর্ব উত্তরের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ট্রোমসো যান। ওখানকার মুসলমানদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে তিনি জানতে পারেন, কীভাবে তাঁরা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিল রেখে সিয়াম সাধনা করছেন।

ট্রোমসো শহরটি ভৌগলিকভাবে আর্কটিক সার্কেল বা সুমেরু বৃত্তের প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। শহরের চারদিক বরাফাবৃত পর্বতমালা ও সমুদ্রের খাঁড়ি দিয়ে ঘেরা। প্রতি বছর মে মাসের শেষদিক থেকে শুরু করে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত শহরটির বাসিন্দারা ‘মিডনাইট সান’ বা ‘মধ্যরাতে সুর্য’ দেখার এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সময়ের হিসেব কষে ঠিক এ বছরই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্রোমসোর মুসলিম সম্প্রদায় পুরো রমজানে রাতের দেখা পাবেন না। তাহলে কীভাবে তারা রোজা রাখছেন? ১৯৮৬ সালেও এই একই সময়ে রোজা এসেছিল। কিন্তু সে সময়ে ট্রোমসো শহরে কোনো মুসলিমের বসবাস ছিল না বলে প্রশ্নটি সামনে আসেনি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিমদের আগমনে বর্তমানে ট্রোমসো মুসলমানদের শহরে পরিণত হয়েছে। সেখানকার অধিবাসীরা জানিয়েছেন, সুর্য এখানে কখনোই ডোবে না, ২৪ ঘন্টাই আকাশের মাঝখানে অবস্থান করে।

তাই এ শহরে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হিসেব করে রোজা রাখা কখনোই সম্ভব নয়। এখানকার মুসলমানরা নিকটবর্তী এমন কোনো দেশের সঙ্গে সময় মিলিয়ে রোজা রাখেন যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়। আবার সৌদি আরবের মক্কা নগরীর সময়ের সঙ্গে মিল রেখে দিনের হিসাব করেও রোজা রাখার নিয়ম রয়েছে। তবে সেটা তারা সম্মিলিতভাবে আলোচনা করে নির্ধারন করেন। এ বছর সৌদি আরবের মক্কার সময়ের সঙ্গে মিল রেখেই তারা রোজা পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মক্কায় যদি ভোর পাঁচটায় সূর্যোদয় হয় তাহলে ট্রোমসোর মুসলিমরাও নরওয়ের স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটা থেকেই দিনের সময় গণনা শুরু করবেন। মক্কার দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য খুবই ভারসাম্যপূর্ণ বলেই তারা ১৪০০বছর পরে এ নিয়মটি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু রোজা নয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়ও তারা এভাবেই বিন্যস্ত করে পালন করছেন। এ তো গেল দিনের কথা।

ট্রোমসোর মুসলমানদের এর আগেও অনেকবার রোজা রাখার জন্যে সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ দিতে হয়েছে। শীতকালে তাদেরকে এর ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। কারণ শীতকালে এখানে সারাক্ষণই রাত থাকে। সূর্যের দেখা মেলে না প্রায় ছয় মাস। তাই শীতকালের জন্যেও তারা মক্কার নিয়মই অনুসরণ করেন। গ্রীষ্মকালে যেমন সূর্য অস্ত যায় না তেমনি শীতকালে সূর্যোদয় হয় না। তাই মক্কার সময় অনুসরণ করাটাই তারা শ্রেয় মনে করেন।

এখন প্রশ্ন হলো:

১. ট্রোমসোর মুসলিমদের প্রচলিত এই মক্কামান সময়ে সালাত আদায় বা সাওম পালন কি ছহিহ ইসলাম সম্মত?

২. যদি ছহিহ শরীয়াসম্মত না হয়, তবে রোযা-নামাজের বিষয়ে তাদের জন্য বিকল্প পদ্ধতি কোনটি?

৩. আর যদি ট্রোমসোর পদ্ধতি ছহিহ ইসলাম সম্মতই হয়, তবে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলসহ ফিনল্যান্ড, আলাস্কা, টরন্টো, আইসল্যান্ডে মক্কার সাথে মিলিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং রোযার সেহরী ইফতারের সময় নির্ধারণ কেন ছহিহ ইসলাম সম্মত হবে না? আর এই ছহিহ পদ্ধতিটার আগাম ধারনা ১৪০০ বছর আগের এক সর্বজ্ঞানের আধার দাবিকৃত আসমানি কিতাব খানায় কেন রইলো না? আমাদের সর্বজ্ঞানী মহানবীই বা কেন তার শত হাদিসের কোথাও এমন একটি মরু-মেরুর ভৌগলিক ধারণা এবং আহ্নিক বা বার্ষিকগতির আগাম ফায়সালা দিতে পারলেন না?

৪. আবার যদি তাই ছহিহ হয়, তবে রোযার সংজ্ঞা শাশ্বত বা সার্বজনীনই বা কেমনে হয়? যা স্থানকাল অবস্থাভেদে তার নিজস্ব সুবিধাবাদী সংজ্ঞা বদলায়। বদলে যাওয়া সংজ্ঞা ধ্রুবসত্য ধারণ করতে পারে না। আর যা ধ্রুবসত্য নয়, সেটা ঐশ্বরিক ধর্মসত্য কেমনে হয়?

৫. রোযার মাসে আল্লাহ শয়তানকে বন্দী করে রাখেন, যাতে সে কাউকে প্ররোচিত করতে না পারে। তাহলে বাকি ১১ মাস কেন বন্দী করে রাখা হয় না? তবে শয়তানকে বাকি ১১ মাস মুক্ত করে দিয়ে আল্লাহ নিজেই কি প্ররোচনার দায় নিচ্ছেন না? অথবা আল্লাহ বাকি ১১ মাস শয়তানকে বন্দী করে রাখতে অক্ষম? তবে আর আল্লাহ সর্বশক্তিমান হয় কী করে? তবে কি যে আল্লাহ. সে-ই কি শয়তান নয়?

ভবঘুরের অনুসিদ্ধান্ত:

একজন স্থুলদৃষ্টির দৃশ্যত সমতল পৃথিবী দৃষ্ট মরু-জ্ঞানীর পক্ষে মেরুর জ্ঞান ছিলো না বিধায়ই ইসলাম মধ্যযুগীয় মরুভুমির আঞ্চলিকতাদুষ্ট কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঈশ্বর-শয়তানের গোলকধাঁধার কথিত ধর্ম। যা পৃথিবীর সকল অঞ্চলের জন্য একযোগে প্রয়োজনীয়তা হারায়, সেইসাথে রোজার নামে অবৈজ্ঞানিক উপোসের উপাসনা স্রেফ উপহাসের খোরাক যোগায় মাত্র। আর এমনি এক উপহাস্য (কু) সংস্কৃতির আগ্রাসন মরুসাম্রাজ্যবাদীদের হাত ধরে চিরায়ত নাতিশীতোষ্ণ লোকায়ত নীরিশ্বরবাদী চার্বাকের বাংলায় হাজার বছরের চাপানো দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এই স্থুল উপাসনার তাগিদেই চলে মাসব্যাপী অন্যের খাদ্য অধিকার হরণের মহোৎসব। রোজার মাসে আল্লাহ খাবারের হিসাব নেবে না, তাই সংযমের নামে ভুঁড়িভোজ, সংযমের নামে অপচয়, মিতব্যয়ের নামে অপব্যয়। রোজার মাসের সামগ্রিক লেনদেনের গ্রাফচিত্রটার উর্ধ্বমুখী উল্লম্ফিত চরিত্রটাই বলে দেয়, ধার্মিক তুমি কতোটা সংযমী। আর সংযমের নামে অন্যের ওপর কতোটা গরিষ্ঠের সহিংস বাড়াবাড়ি? তাই মুমিনীয় ধর্মের বাড়াবাড়িকে তাড়াতাড়ি দমন করতেই -

চীনে রোজা পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির কমিউনিস্ট সরকার। একই সঙ্গে রমজান মাসে সব ধরনের খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্ট খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  আল জাজিরার খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

একদিন সারা পৃথিবী রোজার নামে এ মুমিনীয় সংযমী ভণ্ডামি নিষিদ্ধের দাবি তুলবে, সেইদিন বেশি দূরে নয়। আমি সেই সুদিনের অপেক্ষায়।

* তথ্যসুত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, যুগান্তর, আমারদেশ, thedhakatimes24, উইকিপিডিয়াসহ অন্যান্য।