১০ মে, ২০১৫

আমার আরবি ভাষাপ্রেমিক নানা

লিখেছেন সাংকৃত্যায়ন

আমার নানা আরবি-প্রেমিক ছিলেন। নানা বলতেন আরবিতে বাণী দিয়েছেন আল্লাহ। আল্লাহর পবিত্র কিতাবও আরবিতে লেখা। তাই আরবি ভাষা - সব ভাষার সেরা ভাষা। এই ভাষার ওপর কোনো ভাষা নেই, কোনোদিন কোনো ভাষা এর ওপর সৃষ্টিও হবে না। খেজুরের দেশে জন্ম পবিত্র আরবি ভাষার। আরবি ভাষা মুসলিমদের ভাষা। এই ভাষা কোনো সাধারণ ভাষা নয়, আল্লাহর ভাষা। 

নানা আমাকে প্রতিদিন স্কুলে দিয়ে আসতেন, নিয়েও আসতেন। একবার নানাকে দেখেছি স্কুলের ডাস্টবিনের পাশে পড়ে থাকা ছেঁড়া ছোট্ট একটি পৃষ্ঠাকে চুমু খেতে। নানার প্রচণ্ড শুচিবাই ছিল; তবুও নানা ময়লা কাগজে চুমু খেয়েছিল। নানাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ময়লা কাগজে চুমু খাওয়ার কারণ। নানা বলেছিল, পড়তে পারি না, তবে লেখা দেখেই চিনতে পারি; এই কাগজে আরবি লেখা। আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা; যাকে বলে আল্লাহর ভাষা। আল্লাহর ভাষায় খারাপ কিছুই লেখা থাকে না। 

পবিত্র ভাষার প্রতি নির্মোহ টান থেকে নানার আজন্ম ইচ্ছে ছিল খেজুরের দেশে বেড়াতে যাওয়ার। ইচ্ছে বুকে নিয়েই নানা একদিন মারা গেলেন। কিন্তু নানার ইচ্ছে পূরণ হয়নি। নানার মৃত্যুর পর প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম, বড় হয়ে একদিন খেজুর গাছের দেশে যাবো। নানার ইচ্ছে পূরণ না হলেও আমার ইচ্ছে পুরণ হয়েছে - আমি এখন খেজুরের দেশে মজুর। আমার মত অনেক বাঙালি এই দেশে থাকে। তাদের শ্রমিক বলা হয়। সবাই কাজের জন্যই এই দেশে আসে। ঠিকমত কাজ না পারলে গালি খাই। গালিটা আরবিতেই দেয়া হয়। নানা বলেছিল, আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা, আল্লাহর ভাষা। আল্লাহর ভাষা কোনোদিনও অপবিত্র হয় না। আমার মালিক একদিন আমাকে খুব মেরেছিল, গালি দিয়েছিল। তবে বেতের আঘাতের থেকে গালির আঘাতটাই ছিল খুব বেশি। নানা বলেছিল আল্লাহর ভাষা পবিত্র ভাষা। কিন্তু সেদিন বুঝে পাই নি, আরবি ভাষায় বলা মাদারচোদ গালিটা পবিত্র হল কেমনে? 

ছোট বেলায় বাংলা-ইংরেজি শিক্ষকের মত আমার আরবি ভাষার শিক্ষক ছিল। নানাই সেই শিক্ষক রেখেছিলেন। তিনি চাইতেন, আমি আরবি পণ্ডিত হই। আমাকে জোর করেই আরবি শেখানো হতো। আমি শিখতে চাইতাম না। তবে দুর্ঘটনায় নানার মৃত্যুর পর থেকে আমি মনোযোগ দিয়েই আরবি শিখেছি। বাংলা-ইংরেজির মত আমি এখন আরবিও পড়তে পারি। নানা বলেছিল, আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা; পবিত্র ভাষায় পড়তে জানার মজাই আলাদা। অভাগা নানা সেই মজা কোনোদিন পায় নি; পেয়েছি আমি। আমি আরবি ভাষা খুব ভালো বুঝি। 

ছোট ছোট বইতে এক ধরনের সুন্দর গল্প পাওয়া যায়, যার নাম পর্ন স্টোরিস, বাংলায় বলা হয় চটি। পৃথিবীর সব ভাষায় চটি গল্প পাওয়া যায়। এমনকি আরবিতেও। আমি আরবি পড়তে পারি, তাই ইন্টারনেট থেকে হাজার হাজার চটি, আরব্য-রজনী আরবিতেই পড়ি। আমার নানা আরবি ভাষার প্রেমিক ছিলেন। তবে আরবি পড়তে জানতেন না। এমন কি বাংলা-ইংরেজিও পড়তে জানতেন না। তাই সুন্দর সুন্দর অশ্লীল গল্পগুলি নানা কোনোদিন পড়তে পারেননি; নানীর সাথে বাসর ঘরে সেই অশ্লীল গল্পের আড্ডা দিতে পারেননি। 

প্রিয় নানাকে দেখেছি আরবি ভাষার ময়লা কাগজে চুমু খেতে। আরবি ভাষার জন্য নানা শহীদও হতে পারতেন। নানা আরবি ভাষার পবিত্র বই থেকে অনেক কিছুই মুখস্থ করেছিলেন; সেই মুখস্থ বাণীতে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। নানা আরবি কোনো শব্দের অর্থও জানতেন না। তিনি কোনোদিন পবিত্র বই পড়ে দেখেন নি, কারণ তা ছিল আরবিতে। সেই বাণীতে কি হত্যার পক্ষে বলেছে, নাকি বিপক্ষে বলেছে নানা সে কথাটিও জানতেন না। তবে নানা বারবার বলতেন আরবি পবিত্র ভাষা। এই ভাষায় আল্লাহ বাণী দিয়েছেন। এই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে খুনও করতে হয়। স্কুলের ডাস্টবিনের ময়লা কাগজে নানা চুমু খেয়েছিল। ময়লা পবিত্র কাগজটিকে জলে ভাসিয়ে দিতে নানা নৌকা নিয়ে গিয়েছিল নদীর মাঝখানে। সেদিন বৈশাখী ঝড়ে নদীতেই নানার মৃত্যু হয়। অনেকে বলে, মালাউন মাঝির সাথে ভাষা নিয়ে ঝগড়া করায় নানাকে খুন করা হয়েছিল। সেই থেকে আমি মনোযোগ দিয়ে আরবি শিখেছি। 

এখন আমি আরবি ভাষার দেশে থাকি, আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা। তবে এই দেশে ডাস্টবিনে আবর্জনা ফেলার কথাটি ডাস্টবিনের গায়ে আরবিতেই লেখা হয়। আমি দেখেছি পাবলিক টয়লেট, মদের দোকান, জুতার দোকান, জুতার উপরে নিচে জুতার সাইজ, নারীর ব্রা সাইজ, কনডম, পুরুষের আন্ডারওয়ারের সব নামই তো আরবিতেই লেখা। নানা বলেছিল, আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা। তাই পবিত্র ভাষায় চুদির ভাই বলা অপবিত্র হবে কি না, জানি না। তবে বুঝতে পারি, আল্লাহ কোটি কোটি মানুষের মাথা দিয়েছেন, কিন্তু সেই মাথায় যুক্তির আগুন জ্বালানোর বোধশক্তি দেননি। 

রাস্তায় পড়ে থাকা আরবি ভাষার কাগজে নানাকে চুমু খেতে দেখেছি। নানা বিশ্বাস করতো, আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা। এই ভাষায় অশ্লীল শব্দ বলতে কিছুই নেই। খেজুরের দেশে এসে দেখেছি, আরবি ভাষা কনডমের প্যাকেটে, স্যানিটারি ন্যাপকিন সব পাওয়া যায়। শুধু আমার নানা জানতেন না। কারণ আমার নানা আরবি পড়তে পারতেন না। পড়তে জানলে নানা ঠিকই বলতেন - মাঝে মাঝে আল্লাহর ভাষাও অপবিত্র হয়।