২২ ফেব, ২০১৫

ওহুদ যুদ্ধ – ১৬: নবী-গৌরব ধুলিস্যাৎ!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ৬৯): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – তেতাল্লিশ

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ > পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩ > পর্ব ৬৪ > পর্ব ৬৫ > পর্ব ৬৬ > পর্ব ৬৭ > পর্ব ৬৮

কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ও তাঁর সৈন্যদল ওহুদ যুদ্ধ শেষে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে রওনা হবার পরের দিন সকালে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর অনুসারীদের কীরূপে আবু সুফিয়ান ও তাঁর সৈন্যদলের পশ্চাদ্ধাবন করার আদেশ জারি করেছিলেন ও তিনি তাদের সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে আট মাইল দূরবর্তী 'হামরা আল-আসাদ' পর্যন্ত গমন করেছিলেন, তার আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে। কুরাইশরা মক্কায় প্রত্যাবর্তনের সময় পথিমধ্যে তাঁদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে "মুসলমানদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার" জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পুনরায় মদিনায় প্রত্যাবর্তন এবং সেই সিদ্ধান্ত আবারও পরিবর্তন করে তাঁদের মক্কায় প্রত্যাবর্তনের যে উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে, তার সত্যতা কী কারণে প্রশ্নবিদ্ধ, তার আংশিক আলোচনাও আগের পর্বে করা হয়েছে।

ইসলামের একান্ত প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত একটি বিশেষ কারণে ইসলামের সকল ইতিহাস ভীষণ পক্ষপাতদুষ্ট, একপেশে ও মিথ্যাচারে সমৃদ্ধ (পর্ব: ৪৪)! এই পক্ষপাতদুষ্ট ও একপেশে ইতিহাস থেকে সত্যকে আবিষ্কার করা অত্যন্ত দুরূহ, গবেষণাধর্মী ও সময় সাপেক্ষ প্রচেষ্টা। কিন্তু তা কখনোই অর্থহীন নয়। কারণ:

জগতের সকল প্রতিষ্ঠিত ধর্মের ধর্মেশ্বর (ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত মানবসৃষ্ট ঈশ্বর) ও তাদের নামে আরোপিত অপবিশ্বাস ও মিথ্যাচার প্রচার ও প্রসারের বাহন মূলত তিনটি:

১) পারিবার/সমাজ আরোপিত শিশুকালের মগজ ধোলাই (Childhood Indoctrination), 
২) শাসক ও যাজক চক্রের পরস্পর নির্ভরতায় (symbiosis) ধর্মেশ্বরের লালন-পালন, ও
৩) অজ্ঞতা (Ignorance)

কোনো ব্যক্তির জন্মের স্থান ও তাঁর শিশুকালের বেড়ে উঠার পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। শাসক-যাজক চক্রের তৎপরতাকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সাধারণ লোকের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে, অজ্ঞতাকে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করা ও সত্য-সন্ধানের প্রচেষ্টা জগতের সকল মানুষই উদ্যোগী হয়ে করতে পারেন।

ধর্মের অপবিশ্বাস রোধ ও তার করাল গ্রাস থেকে মুক্তির প্রতিষেধক হলো “জ্ঞান (Knowledge)”; আর, যে কোনো জ্ঞান অর্জনের সর্বপ্রথম শর্ত হলো জানার আগ্রহ (Willing to learn); তারপর উদ্যোগ গ্রহণ ও প্রচেষ্টা।

ইন্টারনেট প্রযুক্তির আবিষ্কার, প্রসার ও সহজলভ্যতায় সত্যানুসন্ধান সহজতর। উদ্যোগী পাঠকরা ইচ্ছে করলেই আদি উৎসে গিয়ে (Primary source of Islamic annals) প্রকৃত তথ্য অনায়াসেই জেনে নিতে পারেন।

আজকের পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। এই ১৬০ কোটি মানুষ আজ জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, চিন্তা-ভাবনায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিক্ষা-মর্যাদায় পৃথিবীর সর্বনিম্ন (পর্ব: ১৫); ধর্মের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে এই পরিস্থিতি থেকে তাঁদের মুক্তি অসম্ভব!

ওহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলীর সঙ্গে বদর যুদ্ধকালীন ঘটনা সরাসরি ও বদর যুদ্ধ পরবর্তী ঘটনা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত। আর বদর যুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত ঘটনা হলো নাখলা ও নাখলা পূর্ববর্তী অভিযান।

তাই মদিনায় মুহাম্মদের স্বেচ্ছা-নির্বাসনের (হিজরত) পর বদর যুদ্ধ-পূর্ববর্তী, বদর যুদ্ধকালীন ও বদর যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদের বাণী ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে ওহুদ যুদ্ধের বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। তাই ত্রাস-হত্যা ও হামলার আদেশের গত বিয়াল্লিশটি পর্বের প্রাসঙ্গিক অতি চুম্বক ঘটনাগুলোর দিকে আর একবার মনোনিবেশ করা যাক:

বদর যুদ্ধ-পূর্ববর্তী মুহাম্মদের বাণী ও কর্মকাণ্ড (পর্ব: ২৮-২৯): 

মুহাম্মদ ও তাঁর মক্কাবাসী অনুসারীরা (মুহাজির) তাঁদের মদিনা আগমনের মাস সাতেক পরে জীবিকার প্রয়োজনে রাতের অন্ধকারে বাণিজ্যফেরত নিরীহ কুরাইশ কাফেলার ওপর অতর্কিত হামলা করে তাদের মালামাল লুণ্ঠনের (ডাকাতি) অভিযান শুরু করেন।

পর পর সাতটি ডাকাতি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সফলতা আসে অষ্টম বারে, নাখলা নামক স্থানে। কোনো মদিনাবাসী মুহাম্মদ-অনুসারীই (আনসার) এই আটটি হামলার কোনোটিতেই অংশগ্রহণ করেননি।

ওহুদ যুদ্ধের ঠিক চোদ্দ মাস আগে নাখলা অভিযানে মুহাজিররা বাণিজ্যফেরত নিরীহ কুরাইশ পথযাত্রীর মালামাল লুণ্ঠন, একজনকে খুন এবং দু'জনকে বন্দী করে ধরে নিয়ে এসে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফেরত দেয়ার মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসের আগ্রাসী ও নৃশংস রক্তাক্ত পথযাত্রার সূচনা করেন (পর্ব:২৯)। 

নিরীহ মানুষকে খুন করা, বন্দী করে ধরে নিয়ে এসে মুক্তিপণ আদায় করা ও তাঁদের মালামাল লুণ্ঠন করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়া উপার্জিত অর্থে পার্থিব সচ্ছলতার প্রয়াসকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ তাঁর সৃষ্ট স্রষ্টা আল্লাহর ঐশী বাণী অবতারণার মাধ্যমে (২:২১৭) বৈধতা প্রদান করেন।

সর্বজনবিদিত এ সকল গর্হিত আগ্রাসী নৃশংস কর্মকাণ্ড মুহাম্মদের প্রচারিত ইসলাম নামক মতবাদে “মহৎ কর্ম (জেহাদ)" হিসাবে স্থান লাভ করে! 

বদর যুদ্ধকালীন মুহাম্মদের বাণী ও কর্মকাণ্ড (পর্ব: ৩০-৪৩):

নাখলা অভিযানের ঠিক দুই মাস পর, ওহুদ যুদ্ধের ঠিক এক বছর আগে, ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বদর প্রান্তে সংঘটিত হয় (১৫ই মার্চ ৬২৪ সাল)।

এই যুদ্ধের কারণ হলো, নাখলা ও নাখলা পূর্ববর্তী অভিযানের অনুরূপ হামলায় কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান বিন হারবের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকারী এক বিশাল বাণিজ্য-বহরের ওপর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরদের অতর্কিত আক্রমণে তাঁদের মালামাল লুণ্ঠন; আরোহীদের খুন, পরাস্ত ও বন্দীর প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে কুরাইশদের প্রতিরক্ষা চেষ্টা। (পর্ব: ৩০)

এই যুদ্ধে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতার ৭২ জন কুরাইশকে (দু'জন বন্দীহত্যা সহ) নৃশংসভাবে করেন খুন ও ৭০ জন কুরাইশকে করেন বন্দী। খুন করার পর চব্বিশ জন কুরাইশ নেতৃবৃন্দের লাশ চরম অশ্রদ্ধায় বদরের এক নোংরা শুকনো গর্তে নিক্ষেপ করা হয়। বন্দীদের নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে সর্ব্বোচ্চ ৪০০০ দেরহাম মুক্তিপণ আদায় করে দেয়া হয় মুক্তি। অন্যদিকে, কুরাইশদের হাতে মোট ১৪ জন মুহাম্মদ অনুসারী হন খুন - ছয় জন মুহাজির ও আট জন আনসার।

বদর যুদ্ধে কুরাইশরা ছিলেন সংখ্যায় ও শক্তিতে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের তুলনায় অনেক বেশি। কুরাইশদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৫০ জন আর মুহাম্মদ-অনুসারীদের সংখ্যা ছিল তাঁদের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম (প্রায় ৩১৩ জন); তা সত্ত্বেও তাঁরা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের কাছে অত্যন্ত করুণভাবে পরাজিত হয়েছিলেন! কী কারণে কুরাইশদের এই চরম পরাজয় ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ পর্ব-৩৪ এ করা হয়েছে।

মুহাম্মদ তাঁর এই সফলতার পেছনের কারণ হিসাবে তাঁর কল্পিত আল্লাহর পরম করুণা ও অলৌকিকত্বের দাবি করেন ও ঘোষণা দেন যে, এই অলৌকিক সফলতায় হলো তাঁর সত্যবাদিতা আর কুরাইশদের মিথ্যাচারের প্রমাণ।

মুহাম্মদ তাঁর এই দাবির সপক্ষে যে সব ঐশী বাণীর অবতারণা করেন তাঁর কিছু নমুনা:

৮:৯ - তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে আরম্ভ করেছিলে স্বীয় পরওয়ারদেগারের নিকট, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন যে, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করব ধারাবহিকভাবে আগত হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে।         

৩:১২৩-১২৪ -বস্তুতঃ আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো। (১২৪) - আপনি যখন বলতে লাগলেন মুমিনগণকে-তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের সাহায্যার্থে তোমাদের পালনকর্তা আসমান থেকে অবতীর্ণ তিন হাজার ফেরেশতা পাঠাবেন।

৮:১২- যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদিগকে তোমাদের পরওয়ারদেগার যে, আমি সাথে রয়েছি তোমাদের, সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়।           

৮:১৭- সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি মাটির মুষ্ঠি নিক্ষেপ করনি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং যেন ঈমানদারদের প্রতি এহসান করতে পারেন যথার্থভাবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ শ্রবণকারী; পরিজ্ঞাত।

৮:৪৩-৪৪- আল্লাহ যখন তোমাকে স্বপ্নে সেসব কাফেরের পরিমাণ অল্প করে দেখালেন; বেশী করে দেখালে তোমরা কাপুরুষতা অবলম্বন করতে এবং কাজের বেলায় বিপদ সৃষ্টি করতে। কিন্তু আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তিনি অতি উত্তমভাবেই জানেন; যা কিছু অন্তরে রয়েছে। (৪৪)-আর যখন তোমাদেরকে দেখালেন সে সৈন্যদল মোকাবেলার সময় তোমাদের চোখে অল্প এবং তোমাদেরকে দেখালেন তাদের চোখে বেশী, যাতে আল্লাহ সে কাজ করে নিতে পারেন যা ছিল নির্ধারিত। আর সব কাজই আল্লাহর নিকট গিয়ে পৌছায়।

৮:৫২- --এরা আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং সেজন্য আল্লাহ তা’আলা তাদের পাকড়াও করেছেন তাদেরই পাপের দরুন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহাশক্তিশালী, কঠিন শাস্তিদাতা।

লুটের মালে (গণিমত) জীবিকা বৃত্তির বৈধতা:

৮:১- আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, গনিমতের হুকুম। বলে দিন, গনিমতের মাল হল আল্লাহর এবং রসূলের।

৮:৪১ - আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্নীয়-স্বজনের জন্য এবং এতীম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য; --

৮:৬৯- সুতরাং তোমরা খাও গনিমত হিসাবে তোমরা যে পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তু অর্জন করেছ তা থেকে।

>>> ধারণা করা কঠিন নয়, মুহাম্মদের প্রচারিত এ সকল বাণী বদর যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত সাফল্যে উল্লসিত ও গনিমতের মাল উপার্জনে উজ্জীবিত মুহাম্মদ-অনুসারীদের বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে। তাঁরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে,

“মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সত্যই আল্লাহর নবী, তাঁর বাণী অবশ্যই সত্য এবং সৃষ্টিকর্তা ‘আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতা বাহিনী’ তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যুদ্ধ করেছেন বলেই তাঁরা এই অসম যুদ্ধে অবিশ্বাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পেরেছেন।”

বদর যুদ্ধ-পরবর্তী মুহাম্মদের বাণী ও কর্মকাণ্ড (পর্ব: ৪৬-৫১):

বদর যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে ওহুদ যুদ্ধ কাল পর্যন্ত গত একটি বছরে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা অতি বৃদ্ধ ইহুদী কবি আবু আফাক কে খুন; পাঁচ সন্তানের জননী আসমা-বিনতে মারওয়ান কে খুন; কাব বিন আল-আশরাফ কে খুন; একজন নিরপরাধ ইহুদিকে খুন এবং সর্বোপরি বনি কেইনুকা গোত্রের সমস্ত লোককে তাঁদের ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি লুট ও ভাগাভাগি বিনা বাধায় সম্পন্ন করেন (বনি নদির গোত্রকে উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছিল ওহুদ যুদ্ধের পরে)।

অবিশ্বাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের উপর্যুপরি একের পর এক এইসব সফলতা মুহাম্মদ অনুসারীদের বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে। তাঁদের অধিকাংশই বোধ করি এই বিশ্বাসে অটল ছিলেন যে, "স্বয়ং আল্লাহ ও তার ফেরেশতাকুল সর্বদাই তাঁদের সাহায্যে নিয়োজিত; তাঁদেরকে পরাজিত করার ক্ষমতা কারও নেই!"

আবদুল্লাহ বিন উবাই সহ যে সব অল্প সংখ্যক মদিনাবাসী মুহাম্মদের বাণী ও কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সমালোচনা বা বিরোধিতা করেন, তাঁদেরকে তাঁরা মুনাফিক রূপে আখ্যায়িত করেন।

তারপর, এই ওহুদ যুদ্ধ! কী ঘটেছিল সেদিন?

এমনই এক পরিস্থিতিতে ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহৎ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আদি উৎসের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো, মক্কাবাসী কুরাইশরা বদর যুদ্ধে তাঁদের প্রিয়জনদের খুন ও অপমানের প্রতিশোধ নিতে এই যুদ্ধের অবতারণা করেন এবং কুরাইশরা যখন মুসলমানদের পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে মুহাম্মদের বহু অনুসারীকে করেন খুন, আহত ও পর্যুদস্ত; তখন,

“আকাশ থেকে আল্লাহ তাঁদেরকে রক্ষার জন্য কোন ফেরেশতা প্রেরণ করেননি।”

নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এই মনোভাবে অটুট ছিলেন যে, মহান আল্লাহপাক তাঁদের সাহায্য করবেন। কিন্তু, তার কোন আলামত প্রত্যক্ষ না করে নিশ্চিতরূপে তাঁরা হতাশ হয়েছিলেন এবং নবীর প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছিলেন। তাই তাঁরা তাঁদের নবীকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ওহুদ প্রান্তে ফেলে রেখে দিকভ্রান্ত অবস্থায় পালিয়ে যান।

যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই,

আল-তাবারীর (৮৩৮-৯২৩ সাল) বর্ণনায়:

"পলায়নরত লোকেরা যুদ্ধে এতই পরিশ্রান্ত ছিলেন যে, তাঁরা জানতেন না, তাঁরা কী করছেন (পর্ব-৬০)।"  

'সেনারা আল্লাহর' নবীকে পরিত্যক্ত করে পালিয়ে যায়, কিছু লোক সূদুর আল-আ'ওয়াসের নিকটবর্তী আল-মুনাককা পর্যন্ত গমন করে। ওসমান ইবনে আফফান ও তাঁর সাথে ওকবা বিন উসমান এবং সা'দ বিন উসমান নামের দুইজন আনসার আল-আ'ওয়াসের নিকটবর্তী ও মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত সূদুর আল-জালাব পাহাড় পর্যন্ত গমন করে। তারা সেখানে তিন দিন পর্যন্ত অবস্থান করে ও তারপর আল্লাহর নবীর কাছে ফিরে আসে। তারা দাবি করে যে, তিনি তাদের বলেছেন, "সেই দিন তোমরা দিগদিগন্তে (far and wide) ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিলে।"

'মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন' এই খবরটি সা'দ বিন উসমানই (আনসার) প্রথম মদিনা-বাসীদের জানিয়েছিলেন। [1]

(Abu Jafar Al tabari says: ‘The army had fled and abandoned the Messenger of God, some of them getting as far as al-Munaqqa, near al-A’was. Uthman b. Affan together with Uqbah b. Uthman and Sa’d b. Uthman, two men of the Ansar, fled as far as al-Jalab, a mountain in the neighborhood of Medina, near al-A’was. They stayed there for three days and then came back to the Messenger of God. They claimed that he said to them, “on that day you were scattered far and wide.”’) [1] 

ইবনে কাথিরের (১৩০১-১৩৭৩ সাল) বর্ণনায়:

আল সূদদির (মৃত্যু ৭৪৫ সাল) রেফারেন্সে ইবনে কাথিরের বর্ণনা আল-তাবারীর বর্ণনারই অনুরূপ। [2]

(‘As-Suddi said, "When the disbelievers attacked Muslim lines during the battle of Uhud and defeated them, some Muslims ran away to Al-Madinah, while some of them went up Mount Uhud, to a rock and stood on it. On that, the Messenger of Allah kept heralding, `Come to me, O servants of Allah! Come to me, O servants of Allah!' Allah mentioned that the Muslims went up the Mount and that the Prophet called them to come back, and said, ((And remember) when you ran away without even casting a side glance at anyone, and the Messenger was in your rear calling you back).'' Similar was said by Ibn `Abbas, Qatadah, Ar-Rabi` and Ibn Zayd.)’ [2]

সর্বোপরি, আল-আমীন উপাধিপ্রাপ্ত রাজসাক্ষী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর বর্ণনায়:

৩:১৫৩- “আর তোমরা উপরে উঠে যাচ্ছিলে এবং পেছন দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলে না কারো প্রতি, অথচ রসূল ডাকছিলেন তোমাদিগকে তোমাদের পেছন দিক থেকে। অতঃপর তোমাদের উপর এলো শোকের ওপরে শোক, যাতে তোমরা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুর জন্য দুঃখ না কর এবং যার সম্মুখীন হচ্ছ সেজন্য বিমর্ষ না হও। আর আল্লাহ তোমাদের কাজের ব্যাপারে অবহিত রয়েছেন।”

>>> ওহুদ যুদ্ধ ক্ষেত্রের এমন এক পরিস্থিতিতে যে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই করা যেতে পারে তা হলো,

"সেই পরিস্থিতিতে ঠিক কতজন মুহাম্মদ-অনুসারী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে না গিয়ে মুহাম্মদের পাশে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন?"

“আক্রান্ত মুহাম্মদ” পর্বের বিস্তারিত আলোচনা ও অন্যান্য উৎসের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কিছুটা ধারণা পেতে পারি:

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮) বর্ণনা:

আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে, আক্রান্ত অবস্থায় মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের কাছে ("আল্লাহর কাছে নয়") বেহেশতের প্রলোভন দেখিয়ে জীবন রক্ষার আবেদন করেন এই বলে:

"আমাদের জন্য কে তার জীবন বিক্রি করবে?”

তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন মাত্র ছয় জন মুহাম্মদ অনুসারী; যাদের পাঁচ জনই হন নিহত এবং একজন গুরুতররূপে আহত ও অল্প সময়ের মধ্যে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। (পর্ব-৬১)

ইবনে কাথিরের (১৩০১-১৩৭৩ সাল) বর্ণনা:

'আল-বুখারী যা নথিভুক্ত করেছেন, তা হলো কায়েস বিন আবি হাযিম বলেছেন, "আমি তালহার হাত দেখেছি, সেটি ছিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত; কারণ ওহুদ যুদ্ধের দিন তিনি নবীকে তা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন।”

দু'টি সহি হাদিসে নথিভুক্ত আছে যে, আবু উসমান আন-নাহদি বলেছেন, "সেই দিন (ওহুদ) যখন আল্লাহর নবী যুদ্ধ করেছিলেন তখন নবীর সঙ্গে ছিলেন শুধুমাত্র তালহা ইবনে ওবায়েদুল্লাহ ও সা'দ।"’ [3]

(Al-Bukhari recorded that Qays bin Abi Hazim said, "I saw Talhah's hand, it was paralyzed, because he shielded the Prophet with it.'' meaning on the day of Uhud. It is recorded in the Two Sahihs that Abu `Uthman An-Nahdi said, "On that day (Uhud) during which the Prophet fought, only Talhah bin `Ubaydullah and Sa`d remained with the Prophet.'') [3]

>>> অর্থাৎ, "সেই পরিস্থিতিতে ঠিক কতজন মুহাম্মদ অনুসারী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে না গিয়ে মুহাম্মদের পাশে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন?"

এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব হলো দুই থেকে ছয় জন মুহাম্মদ অনুসারী; যাদের সবাই নিহত হয়েছিলেন!

ইবনে ইশাক বর্ণনায় আমরা আরও জেনেছি যে,

“আল্লাহর নবীকে রক্ষার জন্য মুসাব বিন উমায়ের যুদ্ধ চালিয়ে যান যতক্ষণে তাকে হত্যা করা হয়। যে ব্যক্তিটি তাকে হত্যা করে, তার নাম ইবনে কামিয়া আল-লেইথি, যে মনে করেছিল যে সেই [মুসাব] ছিল আল্লাহর নবী। তাই সে কুরাইশদের কাছে ফিরে আসে ও বলে, "আমি মুহাম্মদকে হত্যা করেছি।"

ওহুদ যুদ্ধের যে-সময়টিতে মুহাম্মদ আহত ও আক্রান্ত হন, তখন মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁদের নবীকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ওহুদ প্রান্তে ফেলে রেখে দিকভ্রান্ত অবস্থায় পালিয়ে যান; যে ঘটনার সাক্ষ্য হয়ে আছে মুহাম্মদের নিজেরই জবানবন্দী (কুরান-৩:১৫৩)।

প্রশ্ন হলো, আল্লাহর নবীকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছিলেন মুসাব এবং সেই অবস্থায়ই মুসাবকে হত্যা করে ইবনে কামিয়া আল-লেইথি। এমনই এক পরিস্থিতিতে কী ভাবে ইবনে কামিয়া মুসাবকে (নবীর বডি-গার্ডকে) মুহাম্মদ (নবী ভেবে) ভুল করতে পারেন?

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ মক্কায় অবস্থান করেছিলেন সুদীর্ঘ ৫২ টি বছর ও বিভিন্ন ঘটনাবহুল পরিস্থিতিতে সেখানে তাঁর ধর্মপ্রচার করেছেন দীর্ঘ ১২-১৩ টি বছর। ইবনে কামিয়া আল-লেইথি মুহাম্মদকে চিনতেন না, এমন একটি দাবির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? 

তাছাড়া, যুদ্ধক্ষেত্রে ইবনে কামিয়ার সঙ্গে ছিলেন আরও বহু কুরাইশ; তাঁরাও কি মুহাম্মদকে চিনতেন না?

কামিয়ার কাছ থেকে পাওয়া এমন একটি "অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর" পাওয়ার পর অন্যান্য কুরাইশদের সেই স্থানে ছুটে যাওয়াই কি স্বাভাবিক ছিল না?

"আমি মুহাম্মদকে হত্যা করেছি" এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটির শোনার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে কুরাইশরা সেই খবরের সত্যতা যাচাই করার কোনো চেষ্টাই করেনি, এমন বর্ণনা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

বরং এটাই কি স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্পন্ন নয় যে, যুদ্ধের সেই পরিস্থিতিতে আহত ও আক্রান্ত মুহাম্মদকে ওহুদ প্রান্তে ফেলে রেখে তাঁর যে অনুসারীরা সবেগে পলায়ন করেছিলেন, "তাঁদেরই একজন" ধারণা করেছিলেন যে, কুরাইশদের আক্রমণে মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন ও এই গুজবটি অন্যান্যদের মধ্যে প্রচার করেছেন?

মুহাম্মদ ইবনে ইশাক আরও বর্ণনা করেছেন যে, আক্রান্ত মুহাম্মদকে রক্ষার জন্য যে ছয় জন মুহাম্মদ অনুসারী যুদ্ধরত ছিলেন, তাঁদের পাঁচ জন নিহত ও এক জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত (ও অল্প সময় পরে নিহত) হওয়ার পর,

"সেই মুহূর্তে কিছু সংখ্যক মুসলমান পুনরাগমন করেন এবং তাঁর কাছ থেকে শত্রুদের দূরে তাড়িয়ে দেন (পর্ব- ৬১)।"

এ এক অতি আশ্চর্য বর্ণনা!

কারণ ওহুদ যুদ্ধে কুরাইশদের তিন হাজার সৈন্যের ২২ জন নিহত হয়। যদি আমরা ধরেও নিই যে এই ২২ জন সৈন্যের সবাই "উক্ত ঘটনাটির আগে" নিহত হয়েছিলেন, তথাপি সেই মুহূর্তে কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ২৯৭৮ জন। তাঁদের সবাই তখন যুদ্ধের ময়দানে। মুসলমানদের মত গনিমতের মাল আহরণ কিংবা অন্যান্য কাজে তাঁরা লিপ্ত ছিলেন না।

এমনই এক অবস্থায় দিকভ্রান্ত, পর্যুদস্ত, দিগ্বিদিক ছুটাছুটি অবস্থায় পলায়নরত কিছু মুহাম্মদ-অনুসারী পুনরায় ফিরে এসে ২৯৭৮ জন কুরাইশ সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়ে মুহাম্মদকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন, এমন কাহিনী আরব্য উপন্যাসের রূপকথাকেও হার মানায়!

সুতরাং, প্রশ্ন হলো, "কী ঘটেছিল সেদিন?"

ওহুদ প্রান্তে সেদিন সত্যিই কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু, যে-বিষয়টি আমরা সুনিশ্চিত ভাবে জানি তা হলো, "মুহাম্মদের সম্মান ও প্রশংসার হানি হয়, এমন কোন বিষয়ে চিন্তা করাও ইসলামী মতবাদে নিষিদ্ধ; আর তাঁর অসম্মান হয়, এমন কোনো বিষয়ের প্রচার ইসলামী মতবাদে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।"

কিন্তু, ওপরে বর্ণিত সমস্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তই কি স্বাভাবিক নয় যে,

"আহত ও আক্রান্ত মুহাম্মদ সেদিন তাঁর কিছু অতি বিশ্বস্ত অনুসারীদের সহায়তায় (যারা তাঁকে ফেলে তখনও পালিয়ে যাননি) নিজেও পালিয়ে বেঁচেছিলেন?”

>>> আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে, ওহুদ যুদ্ধে আগত ৭০০ জন মুহাম্মদ-অনুসারীর ৭০ জনকে কুরাইশরা হত্যা করেন (পর্ব-৬৮)।

নিহতদের ৬৬ জনই ছিলেন আনসার, চার জন মুহাজির । নিহত আনসার ও মুহাজিরদের এই "অত্যন্ত অসামঞ্জস্য অনুপাত" প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে, ওহুদ যুদ্ধে সেদিন কুরাইশদের সঙ্গে আনসাররাই মূলত: যুদ্ধ করেছিলেন; মুহাজিররা নয়।

অধিকাংশ মুহাজির সফলভাবে পলায়ন করেছিলেন।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকে ও আল-তাবারীর বর্ণনায় আমরা এই সত্য ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছি। আক্রান্ত মুহাম্মদকে রক্ষার জন্য যে ছয় জন অনুসারী এগিয়ে এসে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন "তাঁদের পাঁচ জনই ছিলেন আনসার"।

"— আনাস বিন আল-নাদির ওমর বিন আল-খাত্তাব ও তালহা বিন ওবায়েদুল্লাহ ও তাদের সংগে অবস্থানরত মুহাজির ও আনসারদের কাছে আসেন, তারা ছিলেন বিমর্ষ। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, "কী কারণে তোমরা এখানে বসে আছো?" (পর্ব-৬২)

“ওসমান বিন আফফান পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন মদিনায় নিকটবর্তী পাহাড়ে; ফিরে এসেছিলেন তিন দিন পর (ওপরে বর্ণিত)।

হ্যাঁ, তাই! আনসাররা যখন নবীকে রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে কুরাইশদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন, তখন ওমর ইবনে খাত্তাব ও ওসমান ইবনে আফফান সহ অধিকাংশ মুহাজির নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছিলেন।

ওহুদ যুদ্ধ শেষে রণাঙ্গনের এমনই পরিস্থিতি ছিল যে, যুদ্ধে আগত কুরাইশ মহিলারা হিন্দ বিনতে ওতবার নেতৃত্বে “বিনা বাধায়” হামজা-সহ আরও কিছু মুহাম্মদ অনুসারীর কান ও নাক কেটে নিয়ে তা দিয়ে তাঁরা তৈরি করেন গলার হার, পায়ের মল ও কানের দুল এবং তারপর তাঁরা তা উৎসর্গ করেন সেই মানুষটিকে, যিনি তাঁদের প্রতিশোধস্পৃহা নিবৃত্ত করেছিলেন (পর্ব-৬৪)

কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান ও তাঁর সৈন্যরা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের এ সকল ভীষণ পর্যুদস্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করেননি, এমন বিবেচনা অযৌক্তিক। আবু সুফিয়ান ও তাঁর সৈন্যদল যদি "মুসলমানদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার" অভিলাষী হতেন, তবে এমত পরিস্থিতিতে মুসলমানদের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুন বেশি সৈন্য-শক্তি মজুত থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের আক্রমণ না করে, তাঁদের সাথে শুধুমাত্র বাক্য বিনিময় করে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করতেন না।

আবু সুফিয়ান ও তাঁর সহকারী কুরাইশরা এতটা নির্বোধ ছিলেন, এমনটি মনে করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই।

সত্য হলো, উদার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পরম দৃষ্টান্তের অধিকারী কুরাইশ সম্প্রদায় শুধুমাত্র ভিন্ন-ধর্মাবম্বলী হওয়ার কারণে কোনো ধর্মগুরু ও তাঁর অনুসারীদের নির্মূল করার মানসিকতার অধিকারী কখনোই ছিলেন না (পর্ব: ৪০-৪৩); তাঁরা এসেছিলেন বদর যুদ্ধে তাঁদের প্রিয়জনদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে এবং তা চরিতার্থ করে তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন।

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হেরেম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া; অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে।] 

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৭, ইংরেজী অনুবাদ: W. Montogomery Watt and M.V. McDonald, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, পৃষ্ঠা (Leiden) ১৪১১-১৪১২ http://books.google.com/books?id=efOFhaeNhAwC&printsec=frontcover&source=gbs_ge_summary_r&cad=0#v=onepage&q&f=false

[2] ইবনে কাথিরের কুরান-তাফসীর