৬ ফেব, ২০১৫

ছুপা জিহাদিরা

লিখেছেন পুতুল হক

মুসলমানরা তাঁদের জিহাদ চালিয়ে যাবার জন্য সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন অমুসলিমপ্রধান দেশেও সংগঠনের মাধ্যমে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এরকম ইসলামী দল আমাদের দেশে গোপন এবং প্রকাশ্যে আছে অনেক। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংগঠন তাঁদের জিহাদি আক্রমণের কারণে ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে আলোচিত, কখনো নিন্দিত, অনেকের কাছে আবার নন্দিত।

কিন্তু মুসলমান যে কেবল সংগঠিতভাবে জিহাদ করছে, তা নয়। মানববোমা হিসেবে যারা নিজেদের উড়িয়ে দেয় শত্রু তথা বিধর্মী হত্যার উদ্দেশ্যে, তারা অনেকটা এককভাবে তাঁদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করে। তারা বিচ্ছিন্নভাবে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে আল্লাহ্‌র রাস্তায়। অস্ট্রেলিয়ার ক্যাফেটেরিয়াতে, ফ্রান্সের কার্টুনিস্ট হত্যা এরকম বিচ্ছিন্ন জিহাদির আল্লাহ্‌র রাস্তায় যুদ্ধ। কোনো সংগঠনের সাথে এসব জিহাদির একাত্মতা থাকলেও তারা নিজেরাই নিজেদের লক্ষ্য ঠিক করে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করে। এদেরকে ইসলামের ভাষায় বলে “ফেদায়ী”। 

কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা যায়, তাদের কার্যকলাপের ওপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করা যায়, তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারীর অধীনে আনা যায়, কিন্তু ফেদায়ীদের বেলায় কাজটা খুব কঠিন, এমনকি অসম্ভব। সারা বিশ্বের যত নাস্তিক, কাফের আর মুশরিক আছে, তারা সবাই ইসলামের শত্রু। শত্রুর বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ করে যাওয়া, এক কলেমার ওপর বিশ্বাসে তাঁদের বাধ্য করা, সারা বিশ্ব এক আল্লাহ্‌র আইনের অধীন আনা, যে সমস্ত মুসলমান আল্লাহ্‌র নির্দেশিত পথে জীবন কাটায় না তাঁদের হত্যা করা মুসলমানের প্রতি স্বর্গীয় নির্দেশ। 

কোরআনে আছে অসংখ্য আয়াত, যাতে বলা হয়েছে মুসলমানের দায়িত্বের কথা। অসংখ্য হাদিসের মাধ্যমে মহানবী যেমন জিহাদের নিদর্শন রেখে গেছেন, তেমনি মুসলমানের প্রতি নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কোনো বিচ্ছিন্ন মুসলমান কোনো সময় তাঁর ওপর অর্পিত স্বর্গীয় নির্দেশের বাস্তবায়নে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সে সম্পর্কে কোন পূর্বানুমান সম্ভব নয়। সম্ভব নয় দুনিয়ার সব মুসলমানের প্রতিটি কার্যকলাপ সর্বক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা।

মুসলমান মাত্রই তাঁর কাছে ফেদায়ী বীর, সম্মানের উচ্চাসনে আসীন। কোরআনের বর্ণনা মতে দু’ধরনের জিহাদি চরিত্র আছে। প্রথমটি হল, সে সমস্ত সাধারণ মুসলমান, যারা সর্বদা জিহাদী জযবায় উজ্জীবিত। এবং দ্বিতীয়টি হল, বিশেষ স্বেচ্ছাসেবী দল অথবা ফেদায়ী, যাদের চরিত্র কুরআনের বর্ণনার সাথে মিলে যায়। “এবং এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেয় এবং আল্লাহ তাঁর দাসগনের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল।”(বাকারা- ২০৭)

অধুনা আধুনিক মুসলমান ফেদায়ী কার্যকলাপের সাথে আত্মঘাতী হামলাকারীদের পৃথক করে দেখার চেষ্টা করে। ফেদায়ীদের তারা বীর বলে, কিন্তু এখন একইরকম কাজ আর একই উদ্দেশ্য নিয়ে যখন কেউ আত্মঘাতী হয়, তখন তাঁদের শুধুমাত্র “সন্ত্রাসী” বলে। তারা দাবি জানায় - ইসলামের সাথে এইসব ইসলামী সন্ত্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই। এ যেন “ভুতের মুখে রাম নাম!” মুসলমান বীরদের মধ্যে তারাই উজ্জ্বল, যারা ছিলেন ফেদায়ী। ফেদায়ীদের ইতিহাস ইসলামের গৌরবের ইতিহাস। তাই ওসামা বিন লাদেনকে মুসলমান রাষ্ট্র সন্ত্রাসী আখ্যা দিলেও প্রতিটি মুসলমানের অন্তরে সে বীরের আসন পেয়েছে।

ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব হলেও সম্ভব নয় ফেদায়ীদের নিষিদ্ধ করা। ফেদায়ী হতে পারে কোনো মাদ্রাসার ছাত্র, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক জিন্স পরা বিজ্ঞানের ছাত্র। ফেদায়ী হতে পারে হিজাব আর বোরখায় ঢাকা কোনো কট্টোর মুসলমান নারী কিংবা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কোন আধুনিকা। যে কোনো মুসলমানের অন্তরে একজন বীর ফেদায়ী ঘুমন্ত অবস্থায় থাকতে পারে। যে কোনো সময় সে তাঁর লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। জিহাদির চঞ্চল তাজা রক্ত সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকে আল্লাহ্‌র রাস্তার ধুলোয় প্রবাহিত হবার জন্য।

ইসলামে এমনকি কোনো জিহাদিকে আল্লাহ্‌র রাস্তায় শহীদ হওয়া থেকে বিরত রাখা চরম অন্য্যায়। আল্লাহ্‌র পথে শহীদ হওয়া মুসলমানের জন্য শৌর্যের, বীরত্বের। এরা নবী ও আল্লাহর প্রেমে এতোটাই পাগল যে, শুধুমাত্র প্রাণটা তারা ধারণ করে শহীদ হবার জন্য। বিচ্ছিন্ন আত্মঘাতী হামলাকারী বা ফেদায়ীদের নিয়ন্ত্রন করা শান্তিকামী বিশ্বের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ।