২৭ জানু, ২০১৫

সরস্বতী পুজোর গল্প

লিখেছেন বকধার্মিক

ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর সময় বাতাসে বেশ একটা খুশি খুশি ভাব থাকত। শীতের নরম রোদে এন্তার ক্রিকেট আর সন্ধ্যেবেলা আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা। ২৩ আর ২৬ জানুয়ারির ছুটিতে কখনো সখনো পিকনিক। পাড়ায় এবং স্কুলে সরস্বতী পুজোর তোড়জোড়। সব মিলিয়ে বেশ একটা আনন্দের আবহ থাকত চারিদিকে। আমার নাস্তিকতাবাদে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে আর কখনো পুজো করিনি বটে, তবে প্রসাদের লাইনে আমি সবার আগে থাকতাম। মুগের ডাল আর নারকেল ভেজানো নৈবেদ্য, হরেক রকম কাটা ফল, আর তার ওপরে তো ভোগের খিচুড়ি আর লাবড়া রয়েইছে। বকরাক্ষসের মত গপগপ করে চেটেপুটে সব খেতাম। পুজো না করে প্রসাদ খাওয়ার জন্য মাঝে মাঝেই দু'-একটা বাঁকা কথা, বা কখনো কখনো গালিগালাজও শুনেছি। তবে সে সব গায়ে মাখতাম না। কষ্ট না করলে কি সুখাদ্য নামক কেষ্টটি লাভ হয়?

বাঙালি হিন্দু ছোটবেলা থেকেই সরস্বতী দেবীকে মা দুর্গার কন্যা বলেই জানে। পুরাণে অবশ্য সরস্বতীর জন্মের সম্পূর্ণ আলাদা গল্প আছে। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির ওই গুণ — দেব দেবীদের নিতান্ত কাছের মানুষ, প্রায় ঘরের লোক বানিয়ে তোলে। আর যে মুহুর্তে দেবতা ঘরের লোক হয়ে ওঠে, তখনই সেই সব আদিরসাত্মক কুরুচিপূর্ণ পুরাণের গল্প ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়। তার জায়গা নেয় পাঁচালি। পাঁচালির গল্প নিতান্ত গোলগাল ভালমানুষ হরিপদ কেরাণির মার্কা। আদিরসের খুব একটা ছোঁয়া নেই তাতে। এমনকী বাংলায় যেসব পুরাণের গল্ল সংকলন বেশ জনপ্রিয় ছিল এক সময়, যেমন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরির লেখা পুরাণের গল্ল, তাতেও কিন্তু শুধুমাত্র পুরাণের অপেক্ষাকৃত নির্দোষ গল্লগুলোই স্থান পেয়েছে। এসব পড়েই বোধহয় বাঙালি হিন্দু ভাবতে শেখে যে, হিন্দুধর্ম আর পাঁচটা ধর্মের তুলনায় কতটা নিরীহ। ব্যাপারটা কিন্তু আদৌ তা নয়। জঘন্য কুরুচিপূর্ণ, প্রায় বর্বরোচিত দেবদেবীর গল্পের দৌড়ে সনাতন হিন্দুধর্ম অন্য কোন ধর্মের চেয়ে পিছিয়ে নেই। হয়ত বা কয়েক কদম এগিয়েই রয়েছে। এই সরস্বতী দেবীর গল্পই একটা উদাহরণ। তাঁর প্রতি ব্রহ্মার ব্যবহারটা মোটেই ভদ্ররুচিসম্পন্ন নয়। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, অধিকাংশ হিন্দুই এখন আর সে সব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। কালের নিয়মে ওগুলো মোটামুটি আবর্জনার স্তুপে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

ফিরে আসি সরস্বতী পুজোর কথায়। আমার নাস্তিক জীবন শুরু হওয়ার আগেও সরস্বতী পুজোর কয়েকটা রীতিনীতি নিয়ে মনে বেশ খটকা লাগত। কয়েকটার কথা বলি। প্রথম নিয়মটা ছিল যে, সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া চলবে না। অথচ তখন কুলগাছ ভর্তি নারকুলে কুল ফলে রয়েছে। অপূর্ব তার স্বাদ। পুজো হয়নি বলে খামোখা আমি কুল খেতে পারবনা কেন? কাজেই মনের আনন্দে কুল পেড়ে খেতাম। পাড়ারও দরকার পড়ত না। গাছের তলাতেই এন্তার পাওয়া যেত। কুল খেতে দেখে বন্ধুবান্ধব আর সহপাঠীদের অনেকেরই চোখ কপালে উঠত। জ্যাঠামশাইমার্কা গলায় তারা আমার ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তা জ্ঞাপন করত। তবে সে সব এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বার করতাম।

আরেকটি নিয়ম ছিল যে, পুজোর দিন পড়াশুনো করা চলবে না। স্বীকার করতে অসুবিধে নেই যে, এই নিয়মটা মানতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না। কিন্তু তবুও একটা খটকা লাগত। সরস্বতী যদি বিদ্যার দেবী হয়ে থাকেন, তবে তাঁকে আরাধনা করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় তো বিদ্যাচর্চা। সেটাই তো তাঁর পুজো! তবে পুজোর দিন পড়াশুনো বন্ধ কেন? ‘দেবী কুপিত হবেন’ ছাড়া কোনো বিশ্বাসযোগ্য সদুত্তর নেই কারুর কাছেই।

আরেকটা ব্যাপার আমার প্রচুর হাসির খোরাক ছিল। পুজোর শেষে খাগের কলমে মাথা ঠেকিয়ে রাখতে হয়। তারপর তুলতে হয় মাথা। যার কপালে কলমটা আটকে যাবে, তার বিদ্যালাভ অনিবার্য। যার আটকাবে না, তার বিদ্যালাভের ভবিষ্যৎ কিঞ্চিৎ অনিশ্চিত। এখন মুশকিল হল আমার কপালের আকৃতিটি এমন যে কিছুতেই তাতে কলম আটকাতো না। খালি খসে খসে পড়ে যেত। তাই দেখে মাসিমা পিসিমারা একটু গুনগুন করতেন। সহানুভুতি জ্ঞাপন করতেন। ভাবতেন হয়ত বংশের সর্বপ্রথম মূর্খটি হব আমিই। এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে দেখছি যে, আমার বিদ্যালাভ হয়নি, এ কথাটা অতি বড় শত্রুও বলতে পারবে না।

একটা জিনিস সব থেকে বেশি দৃষ্টিকটু লাগত। পাড়ার দাদা-দিদিদের, বিশেষত যাঁরা সে বছর মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছেন, অনেককেই দেখতাম সরস্বতী মূর্তির সামনে প্রায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে। আর এঁদের মধ্যে অনেকেরই, বিশেষত দাদাদের, সারা বছর পড়াশুনো বইপত্তরের সঙ্গে সম্পর্কটা খুবই ক্ষীণ থাকত। সারাবছর ফাঁকি মেরে একটা দিন দেবীর চরণে হত্যে দিলেই তিনি পরীক্ষার বৈতরণী পার করে দেবেন, এই বিশ্বাসটা সবার মনেই বেশ গভীর ছিল। দিদিদের অনেকে কিন্তু সারা বছর নিয়ম করে পড়াশুনো করতেন। তবু নিজেদের বুদ্ধির ওপর ভরসা না রেখে, তাঁরা ভরসা রাখতেন দেবীর আশীর্বাদের ওপর। ধর্ম যে মানুষের আফিং, এটা কি খুব ভুল কথা? আফিং মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে। ধর্মও তাই।

জ্ঞানচক্ষু কিছুটা উন্মিলীত হলে দেখলাম যে, এক শতাব্দী আগেও আমাদের সুশীল ভারতীয় সমাজে নারীশিক্ষা বস্তুটির প্রায় অস্তিত্ব ছিল না। গল্প-উপন্যাসে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ। ভূগোল বইয়ে পড়লাম যে, এখনো ভারতের অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে স্ত্রীশিক্ষার হার তলানিতে। মনে প্রশ্ন জাগল যে, বিদ্যার দেবী সরস্বতী নিজেই নারী, তবুও মেয়েদের কাছে খাতা-পেনসিল এত দুর্লভ কেন? অথচ সমাজে তো ভক্তি আর ঈশ্বরবিশ্বাসের ছড়াছড়ি। তাহলে? তাহলে কি এই সব পুজো-আচ্চা সবই ভুয়ো? বাবাকে প্রশ্নটা করায় তিনি খুব সুন্দর একটা উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, তোর ক্লাসের অনেকেই তো মানে না বুঝে জিওমেট্রির থিওরেম মুখস্থ করে। তেমনি অধিকাংশ মানুষও ধর্মের বিন্দুবিসর্গ না বুঝে অন্ধের মত ধর্মাচরণ করে। তার ফল এই। সরস্বতী নারী হলেও ভারতের নারী শিক্ষাবঞ্চিত। আমার নাস্তিক্যবাদে দীক্ষাটা পাকাপাকি হয়েছিল সেদিনই।

একটা ভাল গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করি। আমাদের কলেজে সরস্বতী পুজো না হলেও, প্রতিটি হোস্টেলে হত। ফাইনাল ইয়ারের যে-ছাত্রটি সব থেকে ভাল আঁকতে পারত, পুজোর সাজসজ্জার দায়িত্বে থাকত সে। তার সঙ্গে যোগাড়যন্ত্রের দায়িত্বে থাকত হোস্টেলের সোশ্যাল এন্ড কালচারাল জেনারেল সেক্রেটারি। বাংলাদেশে শুনেছি স্কুল কলেজের পুজোয় মুসলমান ছাত্ররাও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যোগদান করে। ভারতে সেটা খুব একটা হতে দেখিনি কোথাও। আমি যে বছর ফাইনাল ইয়ারে ছিলাম, সে বছর সব থেকে ভাল আঁকিয়ে ছেলেটির নাম ছিল হুজেফা শাকির। আর জেনারেল সেক্রেটারির নাম ছিল অমনদীপ সিং বেদী। একজন মুসলমান, আরেকজন শিখ। সরস্বতী পুজোয় কারুরই উৎসাহ থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাদের অনেককেই বেশ অবাক করে দিয়ে তারা নিজেদের দায়িত্ব খুবই সুষ্ঠুভাবে পালন করেছিল। দেবীর সাজসজ্জা হয়েছিল চোখে পড়ার মত সুন্দর।

পুজোর বা পরবের দৌলতে যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিটা এইভাবে ফুটে ওঠে, মানুষের একে অপরের প্রতি ভালবাসা বাড়ে, তাহলে আমি পুজোর হাজার অযৌক্তিক নিয়মকানুনকেও সহ্য করতে রাজি আছি।