১৭ জানু, ২০১৫

ওহুদ যুদ্ধ -১১: হিন্দের প্রতিশোধস্পৃহা!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-৬৪): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – আটত্রিশ

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ > পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩

যুবায়ের বিন মুতিম নামের এক কুরাইশ তাঁর চাচা তুয়েইমা বিন আদির খুনের প্রতিশোধ নিতে ওয়াহশি নামক তাঁর এক দাসকে কী শর্তে ওহুদ যুদ্ধে সামিল করেছিলেন এবং শর্ত অনুযায়ী তাঁর এই অত্যন্ত দক্ষ বল্লম নিক্ষেপকারী আদি আবিসিনিয়া-বাসী দাস কীরূপে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর চাচা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে অমানুষিক নৃশংসতায় হত্যা করেছিলেন, তার আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

এই সেই হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব, যিনি বদর যুদ্ধে শুধু যুবায়ের বিন মুতিমের চাচাকেই নয়, তিনি নৃশংসভাবে হত্যা করেন আরও বহু কুরাইশকে; যাদের মধ্যে ছিলেন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারবের স্ত্রী হিন্দ বিনতে ওতবার পিতা ওতবা বিন রাবিয়া, চাচা সেইবা বিন রাবিয়া ও ভাই আল-ওয়ালিদ বিন ওতবা (পর্ব-৩৪)।

এ ছাড়াও মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা ঐ একই দিনে আবু সুফিয়ান ও হিন্দের এক জোয়ান পুত্র হানজালা বিন আবু সুফিয়ানকে করেন খুন ও আর এক পুত্র আমর বিন আবু সুফিয়ানকে করেন বন্দী। 

স্বজন-হারা শোকাবহ হিন্দ তাঁর এতগুলো একান্ত পরিবার সদস্যের খুনের প্রতিশোধ নিতে দলনেতা আবু সুফিয়ানের সাথে ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন (পর্ব-৫৪)।

যুদ্ধযাত্রা কালে পথিমধ্যে হিন্দ যখনই ওয়াহাশির পাশ অতিক্রম করেন কিংবা ওয়াহাশি তাঁর পাশ দিয়ে যান, তিনি ওয়াহাশিকে অনুপ্রাণিত করেন ও বলেন,

"এই কৃষ্ণ ঠাকুর, চলো, তোমার ও আমাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করো।" [1]

যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন হিন্দ বিনতে ওতবা তাঁর সংগের মহিলাদের নিয়ে সৈন্যদের পেছনে পেছনে গমন করেন। ওহুদ যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি খঞ্জনি বাজিয়ে বিভিন্ন শ্লোগানের (কবিতা আবৃতি) মাধ্যমে কীভাবে কুরাইশ সৈন্যদের উৎসাহ, উদ্দীপনা ও সাহস যুগিয়েছিলেন, তার আলোচনা পর্ব-৫৭-তে করা হয়েছে।

বহু কুরাইশের হত্যাকারী হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে ওয়াহাশি তাঁর বর্শার আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করে তাঁর মালিক যুবায়ের বিন মুতিম, আবু-সুফিয়ান ও হিন্দ বিনতে ওতবা এবং অন্যান্য কুরাইশদের প্রতিশোধস্পৃহা নিবৃত্ত করেন।

আদি মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, হিন্দ বিনতে ওতবা প্রতিশোধস্পৃহায় মৃত হামজার পেট চিড়ে কলিজা কেটে বের করে আনে ও তার কিছু অংশ চিবানোর চেষ্টা করে। তিনি ও তাঁর সহকারী মহিলারা হামজা ও অন্যান্য মৃত মুহাম্মদ অনুসারীদের কান ও নাক কেটে নিয়ে তা দিয়ে তৈরি করে গলার হার, পায়ের মল ও কানের দুল। তারপর সেগুলো তারা ওয়াহাশিকে উৎসর্গ করে তার প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা:

‘সালিহ বিন কেইসান আমাকে [ইবনে ইশাক] যা বলেছে তা হলো, 'ওতবা ও তার সাথের মহিলারা আল্লাহর নবীর অনুসারীদের মৃত দেহগুলো কেটে বিকলাঙ্গ করার জন্য থামে।

তারা তাদের [মৃতের] কান ও নাক কেটে নেয় ও হিন্দ তা দিয়ে তৈরি করে গলার হার ও পায়ের মল এবং তার সেই গলার হার ও পায়ের মল ও কানের দুল যুবায়ের বিন মুতিমের দাস ওয়াহাশি কে উপহারস্বরূপ প্রদান করে।

সে [হিন্দ] হামজার কলিজা কেটে বের করে এবং তা চিবায়, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে ব্যর্থ হয়ে তা নিক্ষেপ করে। [2]

তারপর সে উঁচু পাহাড়ের চুড়াই উঠে গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে বলে:

“শোধ করলাম আমরা তোমাদের বদরের পাওনা
যুদ্ধের বিপরীতে পরের যে যুদ্ধ সে তো আর ও সহিংস।
ওতবাকে হারানোর ক্ষতির বেদনা ছিল অসহ্য আমার,
আরও অসহ্য ছিল ভাই ও চাচা আর প্রথম সন্তান হারানোর।

প্রশমিত করেছি আমি প্রতিশোধ স্পৃহা প্রতিজ্ঞা ছিল যেমন;
হে ওয়াহাশি, প্রশমিত করেছ তুমি মোর বুকের জ্বলন।
আমৃত্যু করবো আমি ওয়াহাশি কে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন,
চলবে তা ততক্ষণ যতক্ষণ না কবরে মোর হাড়ের গলন।”’ [3][4]

(We have paid you back for Badr
And a war that follows a war is always violent.
I could not bear the loss of Utba
Nor my brother and his uncle and my first born.
I have slaked my vengeance and fulfilled my vow.
You, O Wahshi, have assuaged the burning in my breast.
I shall thank Wahshi as long as I live
Until my bones rot in Grave.)

>>> নাখলা ও বদর যুদ্ধের মাধ্যমে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ যে-নৃশংস পথযাত্রার সূচনা করেছিলেন, সেই নৃশংস পথযাত্রায় তাঁর নিজ পরিবারের (হাশেমী বংশে) সর্বপ্রথম বলী হন তাঁর সমবয়সী চাচা এই হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর এই নৃশংস পথযাত্রায় বলী হন তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমা ও তাঁর পরিবার। ইহুদিদের কাছ থেকে লুট করে “ফাদাক” নামক যে সমৃদ্ধ মরূদ্যান (Oasis) টি মুহাম্মদ তাঁর কন্যা ফাতিমা ও জামাতা আলীকে দান করেছিলেন, মুহাম্মদের মৃত্যুর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইসলামী জাহানের প্রথম খুলাফায়ে রাশেদিন আবু বকর ইবনে কাহাফা তা বাজেয়াপ্ত করেন।

ফাতিমা তাঁর পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ৬ মাস কাল জীবিত ছিলেন। দাদা (মুহাম্মদের চাচা) আল আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও জামাতা ওসমান ইবনে আফফানকে সংগে নিয়ে আবু-বকর ও ওমরের কাছে কয়েকবার দেন দরবার করেও ফাতিমা ও আলী “ফাদাক” ফেরত পাননি। [5][6]

আবু বকর ও ওমর-এর এই ব্যবহারে নবী কন্যা ফাতিমা এতই মর্মাহত হন যে, তিনি মৃত্যুর আগে তাঁর স্বামী আলীকে অনুরোধ করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জানাযায় যেন এই আবু বকর ও ওমর ইবনে খাত্তাব অংশ গ্রহণ করতে না পারে।  

ফাতিমার জীবদ্দশায় আলী ইবনে আবু তালিব কখনোই আবু বকরের বশ্যতা (খেলাফত) স্বীকার করেননি।

৬৬১ সালের জানুয়ারি মাসের এক শুক্রবার দিনের (১৭ ই রমজান, হিজরি ৪০ সাল) প্রত্যুষে ফজর নামাজের জন্য মসজিদে ঢোকার প্রাক্কালে কুফা নগরীতে আলী ইবনে আবু-তালিব নৃশংসভাবে খুন হন। খুনিরা ছিলেন মুহাম্মদ অনুসারী মুসলমান, কোনো অমুসলিম কাফের নয়; নাম: মুলজাম আল মুরাদি ও শাবিব বিনা বাজারাহ। [7]

৬৭০ সালের মুহাম্মদের প্রাণপ্রিয় নাতি হাসান ইবনে আলীকে তাঁর স্ত্রী জুদা বিনতে আসা'ত বিন কায়েস বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন, নেপথ্যের নায়ক মুহাম্মদ অনুসারী মুয়াবিয়া বিন আবু-সুফিয়ান বিন হারব; কোনো অমুসলিম কাফের সন্তান নয়। [8]

৬৮০ সালে মুহাম্মদের আর এক প্রাণপ্রিয় নাতি হুসেইন ইবনে আলীকে কারবালা প্রান্তরে নৃশংসভাবে হত্যা করে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া বিন আবু-সুফিয়ান বিন হারবের এক সৈন্য। কাব বিন আল-আশরাফের কাটা মুণ্ডুটির (পর্ব-৪৮) মতই হুসেইনের কাটা মুণ্ডুটা বর্শার মাথায় গেঁথে খুনি তা নিয়ে আসেন ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার কাছে। [9]

মুহাম্মদের মৃত্যুর (৬৩২ সাল) ৪৮ বছরের মধ্যে মুহাম্মদ-অনুসারীরা তাঁর একান্ত নিকট-পরিবারের সমস্ত সক্ষম ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যদের (Immediate able male family members) প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় একে একে খুন করে।

নিবেদিতপ্রাণ আদি মুসলমান ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - ওহুদ যুদ্ধে কুরাইশদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বদর যুদ্ধে তাঁদের প্রিয়জনদের হত্যা ও অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণ!

(চলবে) 

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা

[1] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৭, ইংরেজী অনুবাদ: W. Montogomery Watt and M.V. McDonald, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-88706-344-6 [ISBN 0-88706-345-4 (pbk)], পৃষ্ঠা (Leiden) - ১৩৮৭

[2] এটি মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক সর্বপ্রাণবাদ (Animism) রীতিনীতির বিদ্যমান বিশ্বাস। শত্রুর কলিজা গ্রাস করে তার শক্তি শুষে নেওয়া হয়েছে বলে আশা করা হতো। 

[3] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৩৮৫-৩৮৬
[4] Ibid আল-তাবারী, পৃষ্ঠা (Leiden) - ১৪১৫-১৪১৬

[5] “ফাদাক”

[6] সহি বুখারী: ভলুম ৫, বই ৫৯, নম্বর ৩৬৭ ও ৩৬৮
http://hadithcollection.com/sahihbukhari/92--sp-608/5688-sahih-bukhari-volume-005-book-059-hadith-number-367.html

[7] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ১৭, ইংরেজী অনুবাদ:  G. R Hawting, School of Oriental and African Studies, University of London, Published by - State University of New York press, Albany, পৃষ্ঠা (Leiden) -৩৪৫৯-৩৪৬০
http://www.amazon.com/The-History-Al-Tabari-Eastern-Studies/dp/0791423948#reader_0791423948

[8] হাসান ইবনে আলী কে খুন
http://www.ziaraat.org/hassan.php

[9] কারবালার যুদ্ধ
http://www.britannica.com/EBchecked/topic/312214/Battle-of-Karbala