২৭ ডিসেম্বর, ২০১২

ইসলামে বর্বরতা: নারী-অধ্যায় - ১৩


লিখেছেন আবুল কাশেম


স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেবার অধিকার


ইসলামীরা প্রায়শঃ গলা ফাটিয়ে বলেন যে, ইসলাম নারীকে দিয়েছে তালাকের অধিকার। কী নিদারুণ মিথ্যাই না তাঁরা প্রচার করে যাচ্ছেন। কথা হচ্ছে, এক মুসলিম স্ত্রী কোনোভাবেই তার স্বামীকে তালাক দিতে পারবে না, যেভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়। অর্থাৎ একজন স্ত্রী ইচ্ছে করলেই তার অপব্যবহারমূলক স্বামীর হাত থেকে উদ্ধার পাবে না। তার মুক্তি নির্ভর করবে তার স্বামীর মেজাজের ওপর। একজন স্ত্রী তার কুলাঙ্গার স্বামীকে হাতে-পায়ে ধরে অথবা ইসলামী আদালতে গিয়ে টাকা পয়সা দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। এই ব্যবস্থাকে খুল বলা হয়, তালাক নয়। অন্যায় হচ্ছে এই যে, স্বামীর অবাধ অধিকার আছে স্ত্রীকে কোনো কারণ ছাড়াই যে কোনো মুহূর্তে তালাক দিতে পারে, স্ত্রী তা পারবে না। 

এখন কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে বেদম পেটায়, তবুও স্ত্রী পারবে না ঐ অত্যাচারী, বদমেজাজি স্বামীর হাত থেকে মুক্তি পেতে। এমতাবস্থায় পীড়িত স্ত্রীকে ইসলামী আদালতে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, তার স্বামী তাকে এমন ভাবে পিটিয়েছে যা ইসলামী পিট্টির বাইরে পড়ে। অর্থাৎ পেটানো হয়েছে এমনভাবে যে, মহিলাটির হাড় ভেঙ্গে গেছে অথবা প্রচুর রক্তপাত ঘটেছে। এমতাবস্থায় আদালত চাইলে তাদের বিবাহ ভেঙ্গে দিতে পারে। কিন্তু শর্ত হবে এই যে, মহিলাকে তার স্বামী যা দিয়েছে (মোহরানা), তা ফেরত দিতে হবে।

মারহাবা! এরই নাম হচ্ছে ইসলামী ন্যায় বিচার। যে ভুক্তভোগী তাকেই জরিমানা দিতে হবে। আর অপরাধী সম্পূর্ণ খালাস। শুধু তা-ই নয় সে পুরস্কৃত হচ্ছে। কী অপূর্ব বিচার! এখন এর সাথে তুলনা করুন আধুনিক বিচার ব্যবস্থার।

দেখা যাক কিছু হাদিস এই খুল সম্পর্কে।
মালিকের মুয়াত্তা ২৯. ১০. ৩২:
ইয়াহিয়া-মালিক-নাফী-সাফিয়া বিনতে আবি ওবায়দের মাওলা থেকে। ইয়াহিয়া বললেন সাফিয়া বিনতে ওবায়েদ তাঁর যা কিছু ছিল সবই তাঁর স্বামীকে দিয়ে দিলেন। এ ছিল তাঁর স্বামী থেকে তালাক পাবার জন্যে ক্ষতিপূরণ বাবদ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর এতে কোনো আপত্তি জানালেন না।
মালিক বলেছেন, যে স্ত্রী নিজেকে স্বামীর কাছে জিম্মি করে রাখে, সেই স্ত্রীর খুল অনুমোদন করা হয়। এ ব্যবস্থা তখনই নেওয়া হয়, যখন প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রীর স্বামী তার জন্যে ক্ষতিকর এবং সে স্ত্রীর ওপর অত্যাচার চালায়। এই সব ব্যাপার প্রমাণ হলেই স্বামীকে তার স্ত্রীর সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে।
মালিক বললেন: এমতাবস্থায় স্ত্রী নিজেকে জিম্মি রেখে (অর্থাৎ স্বামীকে টাকা পয়সা দিয়ে) খুল করে নিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী স্বামীর কাছে যা পেয়েছে, তার চাইতেও বেশি দিতে পারবে।
সহজ কথায়, ইসলামী আইনে বলা হচ্ছে যে, স্ত্রী তার বেয়াড়া স্বামী হতে মুক্তি পেতে চাইলে সবচাইতে সহজ পথ হচ্ছে স্বামীকে প্রচুর টাকা পয়সা উৎকোচ দিয়ে তার থেকে তালাক দাবী করা।

এখন পড়া যাক আরও একটি হাদিস।
সুনান আবু দাউদ বই ১২, হাদিস ২২২০:

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বললেন:

সাহলের কন্যা হাবিবার স্বামী ছিল সাবিত ইবনে কায়েস শিম্মা। সে হাবিবাকে মারধোর করে তার হাড়গোড় ভেঙ্গে দিল। হাবিবা নবীজির (সাঃ) কাছে এ ব্যাপারে স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ করল। নবীজি সাবিত ইবনে কায়েসকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন: তুমি তোমার স্ত্রীর কিছু জমি জায়গা নিয়ে নাও এবং তার থেকে দূরে থাক। সাবিত বলল: এটা কি ন্যায় সঙ্গত হবে, আল্লাহর রসুল? নবীজি বললেন: হ্যাঁ, তা হবে। তখন সাবিত বলল: আমি স্ত্রীকে দু’টি বাগান দিয়েছি মোহরানা হিসাবে। এই দুই বাগান এখন তার অধিকারে। নবীজি (সা:) বললেন: তুমি ঐ বাগান দু’টি নিয়ে নাও ও তোমার স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও।
কী অপূর্ব ন্যায় বিচারই না করলেন নবীজি! এর থেকে আমরা বুঝলাম যে, স্বামীর অবাধ অধিকার থাকছে স্ত্রীকে তালাক দেবার। স্ত্রীর স্বামীকে তালাক দেবার কোনো অবাধ অধিকার নেই। খুল কোনো অধিকার নয়, খুল হচ্ছে একটি বিশেষ সুবিধামাত্র।

এই ব্যাপারে দেখা যাক কিছু শারিয়া আইন।
শারিয়া আইন এম ১১.৩ (উমদাত আল সালিক, পৃঃ ৫৪৬):
বিবাহ বিচ্ছেদের জন্যে স্ত্রীকে আদালতের বিচারকের শরণাপন্ন হতে হবে।
স্বামী যদি স্ত্রীর জন্য বাধ্য ভরণপোষণ বহন করতে না পারে তখন স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে পারে। এমতাবস্থায় স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে থাকতে পারে (স্ত্রী নিজের খরচ নিজেই বহন করবে) । স্ত্রী যা খরচ করবে তা স্বামীর দেনা হয়ে থাকবে। স্ত্রী যদি স্বামীর অস্বচ্ছলতা সইতে না পারে, তখনও সে নিজেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে না। স্ত্রীকে ইসলামী আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তার স্বামী তার ভরণপোষণ দেয় না। ইসলামী বিচারক যদি স্ত্রীর প্রমাণ গ্রহণ করেন তখনই উনি বিবাহ বিচ্ছেদ (খুল) দিতে পারেন—কেননা এ ব্যাপারে বিচারকই একমাত্র সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। ইসলামী বিচারক না পাওয়া গেলে স্ত্রী তার বিষয়টা দুজন লোকের (অবশ্যই পুরুষ) হাতে তুলে দিতে পারে।
এখানে অনেক কিন্তু আছে - স্বামী যদি স্ত্রীকে তার মৌলিক খাবার, বাসস্থানের ব্যবস্থা দেয়, তবে স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবে না। এই আইনটি লেখা হয়েছে এভাবে।
শারিয়া আইন এম ১১.৪ (ঐ বই পৃঃ ৫৪৭):
স্বামী স্ত্রীকে মৌলিক খাবারের ব্যবস্থা দিয়ে থাকলে স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের পথ নিতে পারবে না। স্বামী যদি প্রধান খাবার দিতে পারে কিন্তু অন্য আনুষঙ্গিক খাবার না দেয়, অথবা চাকর বাকর না দেয় তখনও স্ত্রী পারবেনা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে। এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে স্বামীর সচ্ছলতার উপর।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামী আদালতে গেলে স্ত্রীর সাথে যৌনকর্মের ব্যাপারে আদালত স্বামীর ভাষ্য গ্রহণ করবে, স্ত্রীর ভাষ্য নয়।
শারিয়া আইন ১১.১১ (ঐ বই পৃঃ ৫৪৬):

আদালত যৌন সংগম উপভোগের ব্যাপারে স্বামীর সাক্ষ্য, প্রমাণ গ্রহণ করবে।

আদালতে যদি প্রমাণ না করা যায় যে স্বামী স্ত্রীর ভাতা দিতে ব্যর্থ—তখন স্ত্রী যা বলবে এই ব্যাপারে তাই গ্রহণ করা হবে। স্বামী স্ত্রী যদি যৌন উপভোগের ব্যাপারে একমত না হয় তখন স্বামী এ ব্যাপারে যাই বলবে আদালত তাই সত্য বলে মেনে নিবে। অর্থাৎ স্বামী যদি বলে যে স্ত্রী তার দেহদান করতে অপারগ, তখন স্বামীর ভাষ্যই সত্যি বলে গৃহীত হবে। এমন যদি হয় স্বামী স্বীকার করে নিলো যে প্রথমে স্ত্রী তার দেহদান করতে রাজী হল, কিন্তু পরে তার দেহ সমর্পণ করল না তখন স্বামীর ভাষ্য আদালত অগ্রাহ্য করতে পারে।
ওপরের ঐ সব আজগুবি ইসলামী আইন থেকে আমরা সত্যি বলতে পারি যে, একজন স্বামী বিবাহের মাধ্যমে কত সহজেই না নারীদের আর্থিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। বিয়ে করার পর স্বামী স্ত্রীর ওপর অত্যাচার শুরু করল, মারধোর করল। যখন এসব অসহ্য হয়ে উঠলো, তখন স্ত্রী স্বামীর পায়ে ধরল তালাকের জন্য - টাকা-পয়সার বিনিময়ে। স্বামী টাকা নিলো এবং স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিল। কী চমৎকার ইসলামী ব্যবস্থা! এই ভাবে সেই স্বামী চালাতে থাকবে তার ব্যবসা। নারীদেহও উপভোগ হচ্ছে, আবার টাকাও পাওয়া যাচ্ছে - এর চাইতে আর ভাল কী হতে পারে?

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন