সোমবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১২

ইসলামে বর্বরতা: নারী-অধ্যায় - ০৮


লিখেছেন আবুল কাশেম


পাঠক! এখানেই শেষ নয়, এ তো সবে শুরু। এর পরে আছে স্ত্রীকে শত-সহস্র হাতে জড়িয়ে ধরা। আবেগে নয়, ভালোবাসায় নয়, মানবতায় তো নয়ই। জড়িয়ে ধরা শৃঙ্খলে-শৃঙ্খলে, আদেশে-নির্দেশে, অজস্র তর্জনী-সংকেতে, ইহকাল পরকালের শাস্তিতে-শাস্তিতে। ক্ষমাহীন স্পর্ধায় দলিত-মথিত করা তার চলন-বলন, আচার-বিচার, মন-মানস, ব্যবহার-ব্যক্তিত্ব, ধ্যান-ধারণা, জীবন-মরণ।

দেখুন:
১. সহিহ্‌ মুসলিম, বই ৮ হাদিস ৩৩৬৬:

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেছেন যে, নবী (দঃ) বলেছেন, যে স্ত্রী স্বামীর বিছানা থেকে অন্যত্র রাত্রি যাপন করে, ফেরেশতারা তাকে সকাল পর্যন্ত অভিশাপ দিতে থাকে।
২. সহিহ্‌ মুসলিম, বই ৮, হাদিস ৩৩৬৭:
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেছেন যে, নবী (দঃ) বলেছেন: যাঁর হাতে আমার জীবন (আল্লাহ) তাঁর নামে বলছি, যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে, আর সে স্ত্রী সাড়া না দেয়, তবে সে স্বামী খুশী না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন।
৩. ইমাম গাজ্জালী, বই এহিয়া উলুম আল দীন, ভলুম ১ পৃষ্ঠা ২৩৫:
নিজের সমস্ত আত্মীয়, এমন কি নিজের থেকেও স্বামীকে বেশী প্রাধান্য দিতে হবে। যখনই স্বামীর ইচ্ছে হবে তখনই সে যাতে স্ত্রীকে উপভোগ করতে পারে সে জন্য স্ত্রী নিজেকে সর্বদা পরিষ্কার এবং তৈরি রাখবে।
৪. ইমাম শাফি শারিয়া আইন (উমদাত আল সালিক) থেকে, পৃষ্ঠা ৫২৫ আইন নম্বর এম-৫-১:
স্বামীর যৌন-আহ্বানে স্ত্রীকে অনতিবিলম্বে সাড়া দিতে হবে যখনই সে ডাকবে, যদি শারীরিকভাবে সে স্ত্রী সক্ষম হয়। স্বামীর আহ্বানকে স্ত্রী তিনদিনের বেশি দেরি করাতে পারবে না।
৫. শারিয়া আইন থেকে (উমদাত আল সালিক), পৃষ্ঠা ৫২৬ আইন নম্বর এম-৫-৬:
যৌন মিলনের জন্য শরীর পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে স্ত্রীকে চাপ দেবার অধিকার স্বামীর আছে।
৬. শারিয়া আইন থেকে, পৃষ্ঠা ৯৪ আইন নম্বর ই-১৩-৫:
স্ত্রী যদি বলে তার মাসিক হয়েছে আর স্বামী যদি তা বিশ্বাস না করে, তাহলে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা স্বামীর জন্য আইনত: সিদ্ধ।
(মানেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু ওই কথাগুলোই লেখা আছে বইতে।)
৭. শারিয়া আইন ত্থেকে, পৃষ্ঠা ৫৩৮ আইন নম্বর এম-১০-৪:

নবী (দঃ) বলেছেন, আল্লাহ এবং কেয়ামতে যে স্ত্রী বিশ্বাস করে, সে স্বামীর অনিচ্ছায় কাউকে বাসায় ঢুকতে দিতে বা বাসার বাইরে যেতে পারবে না।
কেন? বাসার বাইরে যেতে পারবে না কেন? স্ত্রী কি গরু-ছাগল, নাকি গাধা? যে স্ত্রী সারা জীবনের সাথী, তাকে বিশ্বাসও করা যাবে না, স্বামীর উত্তেজনার সময়? খুলে খুলে দেখতে হবে তার শরীর? উহ!! সহবাস, সহবাস আর সহবাস! মিলন, মিলন আর মিলন! শরীর, শরীর আর শরীর! যৌবন, যৌবন আর যৌবন! বেহেশতে হুরী, হুরী, আর হুরীর শরীরের বর্ণনা আর যৌনপ্রলোভন! আইন, আইন আর আইন! চাপ, চাপ আর চাপ! বাঁধন, বাঁধন আর বাঁধন! আইনের-বিধানের এই দম বন্ধ করা বজ্র-আঁটুনিই হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামের সখাত-সলিল, হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকাণ্ড একটা ফস্কা গেরো। আজ যে পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলমান হয়ে গেছেন ‘নন-প্র্যাকটিসিং’, অর্থাৎ নামাজ-রোজা-হজ্ব-জাকাত না করা মুসলমান, তার প্রধান কারণটাই এটা। পৃথিবীতে আর কোনো ধর্ম উঠতে-বসতে প্রতিটি দিন মানুষের এত বেশি সময় নেয় না, দশদিক দিয়ে অক্টোপাসের মত এত চেপে ধরে না। ধর্মের নামে অত্যাচার অনাচার ছাড়াও উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, খেতে-পরতে, ব্যবহারে-ব্যক্তিতে, ধ্যানে-ধারণায়, হাঁচ্চি-কাশিতে, ঘরের বাইরে এমনকি বাথরুমে পর্যন্ত যেতে-আসতে ইসলামের কিছু না কিছু বিধান আছেই। তা হলে আর মগজ দিয়ে করবটা কী? মানুষ কি প্রোগ্রাম করা রবোট নাকি? এ কথাই বলেছিলেন কাজী ওদুদ আর আবুল হূসেন, সেই উনিশ’শো তিরিশ-চল্লিশ সালেই, ‘আদেশের নিগ্রহ’ ইত্যাদি লিখে। এবং এর ফলে মহা ঝামেলায় পড়েছিলেন মওলানাদের হাতে।
“এভাবে চললে বাংলার মুসলমানের সর্বনাশ হয়ে যাবে, ধর্ম বলছে: ‘চোখ বুঁজে মেনে চল, দর্শন বলছে চোখ খুলে চেয়ে দেখ’,- বলে গেছেন আবুল হুসেন সেই আশী বছর আগেই। কেউ কথা শোনেনি, সর্বনাশটা ঘটেই যাচ্ছে প্রায়।
তাহলে আমরা দেখলাম, মুখে ইসলাম যা-ই বলুক, আসলে যৌবনের কামুক উন্মাদনা এবং বাচ্চা বানানোর যন্ত্র হল স্ত্রীর অন্য সবচেয়ে বড় পরিচয়। ইসলাম তো ধরেই নিয়েছে যে, স্ত্রীরা ‘তোমাদের পয়সা খরচ করে’ এবং চিরকাল করেই চলবে। তারা কোনোদিনই নিজেরা উপার্জন করবে না। কাজেই স্বামীর কর্তব্য হল স্ত্রীর খরচ চালানো।

ভালো! তা, সে খরচটা কত? সেটাও আমার-আপনার বুদ্ধি-বিবেকের ওপর, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসার সম্পর্কের ওপর ছেড়ে দিতে ভরসা পায়নি ইসলাম, খরচের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ভেবেই পাই না, ইসলাম আর কতকাল মানুষকে বাচ্চা ছেলের মত আঙুল ধরে ধরে হাঁটানোর স্পর্ধা দেখাবে। পাহাড়ের গুহা থেকে উঠে এসে মানুষ এখন চাঁদের পাথর কুড়িয়ে আনছে, তার কি কোন সম্মান নেই? এই যে মানুষকে যুগ যুগ ধরে এত প্রচণ্ড পরিশ্রম করে, রাতদিন নাওয়া-খাওয়া-ঘুম হারাম করে এত গবেষণা করে নানা রকম রোগের ওষুধ বানাতে হল, তখন ইসলাম কোথায় ছিল? হাসপাতালের অসংখ্য রকম মেশিনের অকল্পনীয় সূক্ষ্ম কর্মকাণ্ড দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। একটা জাহাজ বা এরোপ্লেনেই বা কত শত কারিগিরী! সুপারসনিক প্লেন, আকাশছোঁয়া বিল্ডিং বা টাওয়ার বা সেতু দেখলে, মহাশূন্যগামী রকেট বা সাগরতলের গবেষণার কথা ভাবলে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় মানুষ হিসেবে বুক গর্বে ফুলে ওঠে। সেই মানুষকে বলে দিতে হবে, কার কত খরচ? আইন বানিয়ে লিখে দিতে হবে, চুরি ডাকাতির শাস্তি কী? আশ্চর্য!

এই ব্যাপারে আমরা আরও পড়ব আসছে অনুচ্ছেদে।

এবার আসি খোরপোষের কথায়। খোরপোষ হল স্বামী তার স্ত্রীকে যে ভরণপোষণ দেবে সেটা। এ ভারটা স্বামীকে বইতেই হবে। ভালো! কিন্তু ভালোটা ঐ পর্যন্তই। আসলে এ ব্যাপারে ইসলামের শারিয়া মেনে চললে মানবতা জবাই হতে বাধ্য। বিশ্বাস হচ্ছে না? হবে। হতেই হবে। এর ভেতরে যে কী সাংঘাতিক চালাকি আর নিষ্ঠুরতা আছে, তা-ই আমরা দেখব এবার।

সেই খরচে যাবার আগে একটু কোরান ঘেঁটে দেখা যাক, স্বামী তার স্ত্রীকে কী কী দিতে বাধ্য থাকবে।
বাংলা কোরান, পৃষ্ঠা ৮৬৭, তফসির:
কুরতুবী বলেন: এ আমাদের আরও শিক্ষা দিয়েছে যে, স্ত্রীর যে প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর যিম্মায় ওয়াজিব (বাধ্য), তা চারটি বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ: আহার,পানীয়, বস্ত্র ও বাসস্থান। স্বামী এর বেশী কিছু স্ত্রীকে দিলে অথবা ব্যয় করলে তা হবে অনুগ্রহ, অপরিহার্য নয়।
বোঝা গেল ব্যাপারটা? শিক্ষা নয়, চিকিৎসা নয়, শুধু আহার, পানীয়, বস্ত্র ও বাসস্থান। তা-ও ভালোবেসে দেয়া-নেয়া নয়, শুধু বাধ্য হয়ে দেয়া, অথবা অনুগ্রহ করে দেয়া। এই কি স্বামী-স্ত্রীর অনুপম ভালোবাসার বেহেশতী সম্পর্ক হল, না মস্ত একটা ঘোড়ার ডিম হল, বলুন আপনারা?

যাক, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর লাভ নেই। এবারে স্ত্রীর ওপরে খরচ দেখা যাক, সে খরচটা কতো? বলে গেছেন ইমাম শাফি ই তাঁর বিশাল শারিয়া আইন (উমদাত আল সালিক) বইতে। আসুন এই সব আমরা এখন তন্ন তন্ন করে দেখি।

(চলবে)

blog comments powered by Disqus