১২ নভেম্বর, ২০১২

ইসলামে বর্বরতা: নারী-অধ্যায় - ০৩


লিখেছেন আবুল কাশেম

পর্ব ১ > পর্ব ২

নারীরা যে একেবারেই নিকৃষ্ট তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

এবার শুরু করা যাক বিস্তারিত আলোচনা।
সুরা বাকারা, আয়াত ২২৮ (২:২২৮):
আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের ওপর, নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
এই হল শুরু। পরস্পরের ওপর এই অধিকারটা যে কত প্রকার ও কী কী, তা পরিষ্কার করে পুরো কোরানের কোথাও কিচ্ছু বলা হল না বটে, কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বটা ঠিকই খামচে ধরল পুরুষ, একেবারে চিরকালের জন্য। যাহোক, মেয়েদের যে অধিকার বলে একটা পদার্থ আছে, তার স্বীকৃতি একটুখানি হলেও পাওয়া গেল এখানে। পয়গম্বর হয়ত চেষ্টা করেছিলেন মেয়েদের কিছুটা হলেও অধিকার দিতে, কিন্তু সম্ভবত সেই বেদুঈন পুরুষদের শত শত বছরের প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া ক্ষমতার সমাজে উল্টো প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনায় তিনি এ ব্যাপারে ধুম-ধাড়াক্কার কোনো বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে চান নি।
এবারে সুরা নিসা, আয়াত ৩৪ (৪:৩৪):
পুরুষরা নারীর উপর কর্তৃত্ব শীল। এ জন্য যে আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সেমতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগত এবং আল্লাহ যা হেফাজত যোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাজত করে। আর যাদের মধ্যে আবাধ্যতার আশংকা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করোনা।
না, আর কোন রাখা-ঢাকা নেই, পুরুষের কর্তৃত্বশীলতা বলেই দেয়া হল এখানে। যে কর্তৃত্ব করে, আর যার ওপরে কর্তৃত্ব করা হয়, এ দু’জন কখনো সমান হয় না, হতে পারে না। পুরুষকে কোরান এই কর্তৃত্ব দিল স্পষ্ট ভাষায় সম্ভবত টাকা-পয়সার এবং শারীরিক শক্তির কারণেই। কিন্তু শারীরিক শক্তি কোনো যুক্তিই হতে পারে না। তাহলে আফ্রিকার জঙ্গলের গরিলাই হত মহান আশরাফুল মাখলুকাত, সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। কিংবা হাতী বা তিমি মাছ। টাকা-পয়সার ব্যাপারটা তখনকার সমাজে হয়ত ঠিকই ছিল, কিন্তু আজকে?

আজকের পৃথিবীতে বহু মেয়েই উপার্জনক্ষম, বহু মেয়ের উপার্জনেই সংসারে বাপ-ভাইয়ের মুখে অন্ন জুটছে, বহু স্ত্রীর উপার্জন স্বামীর চেয়ে বেশী, পিতৃহারা বহু সন্তানই মানুষ হচ্ছে শুধুমাত্র মায়ের উপার্জনেই। তা ছাড়া প্রহার করা তো সাংঘাতিক একটা মানসিক অপমানও বটে। যে অধিকার একটা ভালো লোককেও রাগের মুহূর্তে পশু বানিয়ে দিতে পারে, কোনো বেহেশতী ধর্ম তেমন একটা বিপদজনক অধিকার কাউকে কেন দেবে? বৌ বেচারাদের টাকা-পয়সা উপার্জনের সুযোগই দেয়া হয়নি, তাদের খাওয়া-পরার জন্য স্বামীর ওপরে চিরকাল নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে, সে জন্য? তাহলে যেসব স্বামী বৌয়ের উপার্জনে খায়, তারা কি বৌয়ের হাতে মার খাবে? এ অন্যায়টা কিন্তু কোনো কোনো মওলানার মাথায় ঠিকই ঢুকেছে। তাই কোরানের কোনো কোনো অনুবাদে আপনি দেখবেন ‘প্রহার কর’ কথাটার সাথে ব্র্যাকেটের ভেতর ‘আস্তে করে’ কথাটা ঢোকানো আছে। মানেটা কী? ‘আস্তে করে প্রহার কর’ – কথাটার মানেটাই বা কী? এ কি সেই ছোটবেলার পাঠশালার পণ্ডিত মশাইয়ের ধমক: অ্যাই! বেশী জোরে গণ্ডগোল করবি না! গণ্ডগোলের আবার আস্তে-জোরে কী?

আসলে ওটা হল অনুবাদকের কথা, কোরানের নয়। প্রায় সবগুলো অনুবাদেই আল্লার কথার সাথে সু প্রচুর ব্র্যাকেটের মধ্যে অনুবাদকের অবারিত লম্বা নাকটা ঢুকে আছে। এদিকে প্রত্যেকটি অনুবাদ বইতেই কিন্তু মস্ত একটা তফসির, অর্থাৎ ব্যাখ্যার অংশ আছে। তোমার যা বলার সেটা ব্যাখ্যার অংশে বল না কেন বাপু! অনুবাদের মধ্যে নিজের কথা ঢোকানোর অধিকার তোমাকে কে দিল? তা নয়, ভাবখানা এই যে, 'আস্তে করে', কথাটা যেন কোরানের-ই কথা। কিন্তু মানুষ কি গাধা? আস্তে করে ‘ছোট্ট কলমই শাক দিয়ে কি প্রহার কর’ বলে বিরাট কুমীরটা ঢাকা যায়? যায় না। এ প্রহার সকাল-বিকাল দিন-রাত চললেও কোনো অসুবিধে নেই, কারণ সে ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। আর বৌকে পিটিয়ে স্বামী যাতে মনে মনে অপরাধ বোধে না ভোগে, তার ব্যবস্থাও স্পষ্টভাবে দেয়া আছে হাদিসে।
সুনান আবু দাউদ, বই ১১ হাদিস ২১৪২:
ওমর বিন খাত্তাব বলেছেন: নবী (দঃ) বলেছেন, “কোন স্বামীকে (পরকালে) প্রশ্ন করা হবে না কেন সে বৌকে পিটিয়েছিল”।
কি সাংঘাতিক ধর্মীয় সমর্থন, কল্পনা করা যায়? এ-ই হল সেই নির্লজ্জ সমর্থন, যা শুধু বইয়ের লেখাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, কেয়ামতের মত যা নারীর মাথায় ভেঙে পড়ে। এরই শক্তিতে এই ২০০২ সালে দুবাই আদালত বিধান দিয়েছে, স্বামীরা বৌকে পেটাতে পারবে। এই সভ্য যুগে পৃথিবীর কোনো দেশের আদালত এই বিধান দিতে পারে, কল্পনা করা যায়? উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

দুবাই, ১লা এপ্রিল। দুবাইয়ের একটি আদালত রবিবার এক রায়ে স্বামীদের বৌ পেটানোর অধিকার দিয়েছে। দুবাই কোর্ট অফ ক্যাসেশনের রায়ে বলা হয়, 'স্ত্রীদের নিয়ন্ত্রণ’ (নিয়ন্ত্রণে?) রাখতে স্বামীরা তাদের মারধর করতে পারবে। তবে মারধরের মাধ্যমে স্ত্রীদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন বা ক্ষত সৃষ্টি করা যাবে না।" সূত্র: দুবাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক গাল্‌ফ নিউজের বরাতে টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশে বিদেশে, ৪ এপ্রিল, ২০০২ সাল। টরন্টোর ‘নমস্তে ক্যানাডা’ পত্রিকাতেও এ খবর ছাপা হয়েছে।

এখন বলুন, ইসলামে নারীর এ কেমন মর্যাদা? এর পরে আপনি বৌ পেটালে আপনাকে ঠেকিয়ে রাখার মত বাপের ব্যাটা দুনিয়ায় পয়দা হয় নি, হবেও না। সাধারণ মুসলমানেরা বৌ পেটায় না, সে শুধু মানুষের স্বাভাবিক মানবতা। কিন্তু তাহলে মেয়েদের বানানোই বা হল কেন? শস্যক্ষেত্রে শুধু চাষ করে ফলানো ছাড়াও এ ব্যাপারে হাদিস কেতাবে কী বলছে, তা পরীক্ষা করার আগে খোদ কোরান শরীফ কী বলছে তা দেখা যাক।
সুরা আল আরাফ আয়াত ১৮৯ (৭:১৮৯), এবং সুরা আর রূম আয়াত ২১ (৩০:২১):

যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র স্বত্বা থেকে। আর তার থেকেই তৈরী করেছেন তার জোড়া, যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। ‘‘তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক।
হাওয়ার আগে যে আদম সৃষ্টি হয়েছে, তা সবাই জানে। ওপরের আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, কে কার জন্য সৃষ্টি হয়েছে এবং কী জন্য সৃষ্টি হয়েছে। পুরুষের শরীরের সাথে ম্যাচ করেই যে নারীর শরীর বানানো হয়েছে, সেটাও কোনো কোনো পুরুষপন্থী ইসলামী চিন্তাবিদ বলতে ছাড়েন না। জব্বর বিশ্লেষণ বটে। এ বিশ্লেষণে নারী এ জীবনে শুধু বিছানার যৌবন আর বেহেশতে অতি অপূর্ব বাহাত্তর হুরীর শরীরের উত্তপ্ত প্রলোভন। সেখানে নারী মমতার সাগর মা নয়, স্নেহময়ী বোন নয়, প্রেমময়ী স্ত্রী নয়, জ্ঞানী শিক্ষয়িত্রী নয়, সক্ষম নেত্রী নয়, সে শুধু যৌবনের কামুক উন্মাদনা ছাড়া আর কোন কিছুই নয়।

সাধারণ মেয়েরা স্বামীর ইসলামী-পিট্টি খাবে, তা না হয় হল। কিন্তু অসাধারণ নারীরা?

এক নির্ভুল সত্য: শারিয়া হয়েছে পুরুষদের স্বার্থে।

ইসলামে শারিয়া বলে একটা কথা আছে, যা কিনা হল ইসলামী আইন। এ আইন মেয়েদের আর অমুসলমানের জন্য এতই বে-আইন যে, তা দু'-এক কথায় বলে শেষ করা যাবেনা। অমুসলমান খুন করলে মুসলমানের মৃত্যুদণ্ড হবেনা। সাত-সাতটা বিষয়ে মেয়েদের চোখের সামনে ঘটনা ঘটলেও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। যারা নিজের চোখে ধর্ষণ দেখেছে, এমন চার জন বয়স্ক মুসলমান পুরুষের সাক্ষ্য আদালতে পেশ না করতে পারলে ধর্ষিতার কপালে জুটবে পাথরের আঘাতে মৃত্যুদণ্ড (বিবাহিতা হলে) অথবা আর অবিবাহিতা হলে চাবুকের আঘাত। এইসব হল শারিয়ার আইন-কানুন, এতই উদ্ভট যে, বিশ্বাস করাই মুশকিল। এ বইয়ের অন্য জায়গায় বিস্তারিত বলা আছে এ ব্যাপারে, প্রমাণসহ।

এমনিতে কলমা-নামাজ-রোজা-হজ্ব-জাকাত, ইসলামের এই হল পাঁচটা স্তম্ভ, নবীজির দিয়ে যাওয়া। এর পরেও শারিয়া কী করে যেন ইসলামের অঘোষিত ছয় নম্বর স্তম্ভ হয়ে ইসলামের অংশ হয়ে বসে আছে?

উত্তরাধিকারে মেয়েরা তো পুরুষের অর্ধেক বটেই, টাকা-পয়সার লেনদেনেও শারিয়াতে মেয়েদের সাক্ষী হল পুরুষের অর্ধেক। সাক্ষীতে কেন অর্ধেক? কারণ তারা ভুলে যেতে পারে। আর পুরুষ? না, পুরুষ হল যেন কম্পিউটার, কোনোদিন কোনই ভুল সে করতেই পারে না!

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন