রবিবার, ৪ নভেম্বর, ২০১২

ইসলামে বর্বরতা: নারী-অধ্যায় - ০১


লিখেছেন আবুল কাশেম

মুখবন্ধ

প্রায় দশ বছর পূর্বে, যখন আমি সবে মাত্র লেখা শুরু করেছিলাম তখন ‘উইমেন ইন ইসলাম’ নামে একটা ছোট বই লিখেছিলাম। এই লেখা মুক্তমনায় খোঁজ করলে হয়ত আজও পাওয়া যেতে পারে। বইটি পরে আমেরিকার এক অনামা প্রকাশক প্রকাশও করেছিল—যদিও এখন বইটি আউট অব প্রিন্ট। এই বইয়ের এক পাঠক বইটির বাংলা ভাবানুবাদ করার দায়িত্ব নেন। পরে তিনি ‘উইমেন ইন ইসলামের’ ছায়া অবলম্বনে ‘ইসলামে বর্বরতা’ নামে একটা বই লিখায় উদ্যোগী হোন। এই বইয়ের প্রথম অধ্যায় হয় ‘নারী অধ্যায়’ যা ‘উইমেন ইন ইসলামের’ উপর ভিত্তি করে রচনা করা হয়।

দুঃখের বিষয়, ঐ পাঠক নানা কারণে মাঝ পথে ‘ইসলামে বর্বরতা’ বইটির লেখা বন্ধ করে দেন। তা আজ প্রায় দশ বছর হতে চলল। অনেকদিন পর আমি পুরানো নথিপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে আবার হঠাৎ ঐ অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটা আবিষ্কার করলাম। আমি কিছু পরিবর্তন ও পরিমার্জিত করে ঐ লেখকের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে আপাতত: নারী অধ্যায়টুকুই সম্পন্ন করব। সময় পেলে অন্য অধ্যায় সমাপ্ত করার ইচ্ছে রাখলাম।
নিরাপত্তার কারণে আমি ঐ লেখককে XXXX নাম দিয়েছি।

এই লেখার অনেক অংশ XXXX এর লিখা। আমি কিছু নিজে লিখেছি ও কিছু অংশ পরিবর্তন করেছি। যেহেতু এই লেখাটা অনেক পুরানো—কাঁচা হাতের, তাই ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। এ ব্যাপারে পাঠক যদি ভুলভ্রান্তি আমার দৃষ্টিতে আনেন তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।

দশ বছর আগে ইসলামের সমালোচনা করে বাংলায় লেখা পাওয়া দুষ্কর ছিল। আজ সেই পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেক লেখক আজ কলম ধরেছেন ইসলামকে চ্যালেঞ্জ করে। আমি তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই রচনা এই সব নির্ভীক বাঙ্গালি তরুণ লেখকদের প্রতি নিবেদিত।

বাংলায় লেখার দক্ষতা আমার অতি নিম্নমানের। তাই পাঠকের কাছে মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি।

আবুল কাশেম
ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১১

(বিঃ দ্রঃ এই লেখার বাংলা কোরান ছাড়া আর সব উদ্ধৃতির অনুবাদ লেখকের)

সূচনা

সব বাংলাদেশীর মত আমিও ইসলামকে খুবই শান্তির ধর্ম মনে করতাম, সবার মতই আসল ইসলাম সম্বন্ধে জানতাম অল্পই। ইরানে ইসলামী হুকুমত কায়েমে দুনিয়া তার দিকে ফিরে তাকাল। পরে আমিও কৌতূহলী হয়ে ঢুকে পড়লাম ইন্টেরনেটে। ইউরোপ-আমেরিকার শত শত ইসলামী মনীষীর অসংখ্য লেখা পড়ে মনটা খুব খুশী হয়ে গেল। সব সরল পাঠকের মত আমিও তাদের প্রতিটি কথাই বিশ্বাস করলাম। ইসলামে আমাদের মা-বোনদের জন্য এত ভালো ভালো কথা আছে যে, তা দেখে মনটা আমার বড়ই মোহিত হয়ে গেল।

কিন্তু তারপর পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে কেমন যেন সন্দেহ হল। ইসলামী মনীষীরা এত জোর দিয়ে যা কিছু বলছেন, তার দেখি কিছুই মিলছে না। উল্টো বরং মেয়েদের আর্তনাদে সেখানে কান পাতা দায়। পাকিস্তানে, নাইজিরিয়াতে, আফগানিস্তানে তো মোটামুটি ইসলামী আইন (শারিয়া) চালু আছে, কিন্তু তাহলে সে সব দেশে মেয়েদের অবস্থা এত করুণ কেন? আফগানিস্তানের রাস্তায় পুলিশ লাঠি দিয়ে মেয়েদের পেটাচ্ছে, নাইজিরিয়ায় ধর্ষিতা মেয়ে পুলিশের কাছে নালিশ জানাতে এসে শারিয়া কোর্টে মৃত্যুদণ্ড পেল, দুবাই কোর্ট স্বামীদেরকে বৌ-পেটানোর অধিকার দিল, পত্রিকায় এই সব দেখে মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল, আতংকে ত্রাসে শিরশির করে উঠল বুকের ভেতর। সর্বনাশ! অন্য কেতাবে যা-ই লেখা থাকুক, শারিয়ার কেতাবে তো এগুলোই আছে। বাংলাদেশেও শারিয়া চালু করার চেষ্টা চলছে, এমন ঘটলে আমাদের যে কী সর্বনাশ হয়ে যাবে, তা ভেবে ভয়ে হিম হয়ে গেল বুক। তারপর বাধ্য হয়েই ঢুকে পড়লাম ইসলামের ভেতর। ওখানে কী আছে, দেখতে হবে, শেকড় খুঁজে বের করতে হবে নারীর ওপর ইসলামী অন্যায়-অত্যাচারের। অত্যাচারগুলো আসলে কি কেতাবেই আছে, না কি আইনগুলোকে পুরুষরা বিকৃত করেছে?

যা দেখলাম, তাতে দম বন্ধ হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য, এ যে অবিশ্বাস্য! এ কী চেহারা আসল ইসলামের? এ যে প্রকাণ্ড এক দানব ছাড়া আর কিছু নয়! আবার সব কিছু দেখলাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। না, কোনো ভুল নেই, মানুষকে হাজার বছর ধরে নির্লজ্জ মিথ্যে কথায় কঠিন প্রতারণা করেছেন মওলানারা। আমি উচ্চ বিদ্যায়তনে ছাত্র পড়াই, জীবনে অনেক পরীক্ষাই দিয়েছি এবং পাশ করেছি। এবার যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে, এ কথা মনে রেখে আবার পড়া শুরু করলাম ইসলামের মূল বইগুলো, যেখান থেকে উঠে এসেছে ইসলামের আইনকানুন। খাটাতে শুরু করলাম নিজের বিবেক-বুদ্ধি আর কল্যাণবোধ। তখন ধীরে ধীরে ইসলামের এই লুকিয়ে রাখা না-বলা দানবীয় দিকটা স্পষ্ট হয়ে এল চোখের সামনে। না, কোনো ভুল নেই। নারীর প্রতি ইসলামের আদর-সম্মান শুধু লোক দেখানো, মন-ভোলানো। ওগুলো শুধু গজদন্তের মত হাতীর বাইরের সুন্দর দাঁতটা। আসলে ইসলামের মুখের ভেতরে লুকোন আছে মেয়েদের চিবিয়ে খাওয়ার জন্য আরও একপাটি শক্তিশালী বিষাক্ত দাঁত। তারই নাম শারিয়া।

কিন্তু এটা আমি একা দেখলে তো চলবে না। অবশ্যই এ লুকোনো দলিল দেখতে হবে পৃথিবীর সব মানুষকে। যত অবিশ্বাস্যই হোক, যত বেদনাদায়কই হোক, সবাইকে জানতেই হবে ইসলামী শারিয়ার আইন কি শকুনের চোখে তাদের দেখে। খাল কেটে এ রক্তপিপাসু কুমীরকে ডেকে আনবার আগে অবশ্যই সমস্ত শান্তিপ্রিয় মুসলমানকে দেখতে হবে ইসলামের এই ভয়াবহ লুকোনো চেহারা।

তাই হাতে তুলে নিয়েছি কলম, খুব আস্তে-ধীরে ইসলামের আসল চেহারাটা ফুটিয়ে তুলব আপনাদের সামনে। আপনারা পড়ুন, খুঁটিয়ে দেখুন এবং চিন্তা করুন। এবং দেখান মওলানাদের। তাঁদের কী বলার আছে, জানান আমাকে। যদিও জানি, তাঁরা টুঁ শব্দটি করবেন না। কারণ তাঁদের ভালোই জানা আছে যে, লড়াইটা তাঁদের করতে হবে আমার বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁদের নিজেদের কেতাবের বিরুদ্ধেই। এটাও তাঁরা ভালোই জানেন যে, এ ব্যাপারে বেশি নড়াচড়া করলে তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের চোরাবালুর গর্তে ঢুকে মারা পড়বেন।

ধন্যবাদ।

আবুল কাশেম।

প্রথম পাঠ

প্রথমে কোরান দিয়েই শুরু করা যাক, সৌদী আরব থেকে প্রকাশিত মওলানা মুহিউদ্দিন খানের অনুবাদ। কোরানের যে কথাগুলো পুরুষের মন মানসিকতায় ব্রক্ষ্মাস্ত্র হিসেবে গেঁথে রয়েছে, সেগুলো একটু দেখে নেয়া যাক, তারপরে বিস্তারিত তথ্যে যাব আমরা।

আল্লাহ্‌র পছন্দ হচ্ছে পুরুষ—তা কি বলার দরকার রাখে?
কী আছে সুরা নাহল- আয়াত ৪৩ (১৬:৪৩), সুরা হজ্ব আয়াত ৭৫ (২২:৭৫) এ?
নারীকে কোনদিন নবী-রসুল করা হবে না।
সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০৯-(১২:১০৯) তেও একই কথা:
আপনার পূর্বে আমি যতজনকে রসুল করে পাঠিয়েছি, তারা সবাই পুরুষই ছিল জনপদবাসীদের মধ্য থেকে, আমি তাঁদের কাছে ওহী প্রেরণ করতাম।
এবং সিদ্ধান্ত দিয়েছে সুরা আল্ আনাম আয়াত ৯ (৬:৯):
যদি আমি কোন ফেরেশতাকে রসুল করে পাঠাতাম, তবে সে মানুষের আকারেই হত। এতেও ঐ সন্দেহই করত, যা এখন করছে।
কোনো কোনো অনুবাদে দেখবেন, আরবীর ‘পুরুষের আকারে’ শব্দটাকে অনুবাদে ‘মানুষের আকারে’ বলে সমস্যাটাকে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করেছেন চালাক মওলানারা।

আরবীতে মানুষ হল ইনসান আর পুরুষ হল রাজাল। মওলানাদের জিজ্ঞাসা করুন তো, কোরানে কোন শব্দটা আছে?

(চলবে) 

blog comments powered by Disqus