২১ নভেম্বর, ২০১২

ইসলামে বর্বরতা: নারী-অধ্যায় - ০৫


লিখেছেন আবুল কাশেম

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪

জেনে রাখা ভাল নারীরা হচ্ছে পশু এবং ক্রীতদাসীর পর্যায়

যাক, মোল্লা নন্দ কবি ছেড়ে আবার ইসলামে নারীর প্রচণ্ড মর্যাদার দিকে তাকানো যাক।
সহিহ্‌ মুসলিম, বই ২৬, হাদিস ৫৫২৩:
আবদুল্লা বিন ওমর বর্ণনা করছেন: আল্লাহর নবী (দঃ) বলেছেন, দুর্ভাগ্য যদি কিছুতে থাকে, তবে তা হল বাড়ি, ঘোড়া আর নারী।’’
সাব্বাশ!
ইসলামী বিশ্বকোষ (ডিকশনারি অব ইসলাম) থেকে পৃষ্ঠা ৬৭৮-৬৭৯:
সমগ্র মানব জাতির জন্য নারীর চেয়ে ক্ষতিকর আর কিছুই আমি রেখে যাচ্ছি না। দুনিয়া এবং নারী থেকে দূরে থাকবে। কারণ নারীর কারণেই ইসরাইলের পুত্ররা প্রথম পাপ করেছিল।
সাব্বাশ!
সহিহ্‌ মুসলিম, বই ৩৬ হাদিস ৬৬০৩:
উসামা বিন যায়েদ বলেছেন: আল্লাহ’র নবী (দঃ) বলেছেন, আমার পরে পুরুষের জন্য নারীর কারণে ক্ষতির চেয়ে বেশী ক্ষতিকর আর কিছুর সম্ভাবনা আমি রেখে যাচ্ছি না।
সাব্বাশ!

বটে! তারপর? আজকাল মেয়েরা মন দিয়ে পড়াশুনা করে অফিসগুলোতে বড় বড় বস হচ্ছে। তাহলে সে সব অফিসে আমরা কি চাকরী করব না? দেখুন ইমাম শাফির বক্তব্য, স্বয়ং পয়গম্বর কী বলেছেন।
শাফী শরিয়া (রিলায়েন্স অফ দি ট্রাভেলার বা উমদাত আল সালিক), পৃষ্ঠা ৬৭২, নম্বর পি-২৮-১:
নবী (দঃ)বলেছেন: পুরুষরা ধ্বংস হয়ে গেছে যখনি তারা মেয়েদের অনুগত হয়েছে।
মারহাবা, মারহাবা!

ইসলামে আরও একটা অতি চমৎকার খেল আছে, পারিবারিক ব্যাপারে। সেটা হল, স্ত্রী যদি কিছু উপার্জন করে, তাতে তার একচ্ছত্র অধিকার। সে উপার্জন সে নিজের পরিবারে খরচ করতেও পারে, না-ও পারে, স্বামীর অধিকার নেই তার ওপরে। হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই, স্ত্রীর খুবই একটা অধিকার এটা, তাই না? কিন্তু গোপন ব্যাপারটা হল, নিজের পরিবারে বাচ্চা কাচ্চার ওপর খরচ না করে সে স্ত্রী, সে মা সেই পয়সা খরচটা করবে কোথায়? অবশ্যই তার উপার্জন তার পরিবারেই খরচ হবে। তবে কিনা, এই ‘অধিকার’ দিয়ে তাকে কানে কানে বলে দেয়া হল, এ পরিবারে কিন্তু তোমার দায়িত্ব ঐ পর্যন্তই, স্বামীর সমান নয়। কাজেই তোমার অধিকারও ঐ পর্যন্তই, স্বামীর সমান নয়।

যেমন অন্য একটা হাদিসে আছে, হাট-বাজার করে এলে থলিটা পুত্রের হাতে না দিয়ে কন্যার হাতে তুলে দেবে, নবীর (দঃ) আদেশ। বড়ই মধুর আদেশ, একেবারে বেহেশ্‌তি আদর মেশানো। কিন্তু এতে করে কানে কানে সেই কন্যাকে বলে দেয়া হল, এবার আলু-পটলগুলো নিয়ে সটান রান্নাঘরে গিয়ে ঢোক।

সোনালী শৈশবের কথা মনে আছে, যখন আমরা আমাদের বাবা-মায়ের স্নেহে যত্নে আমরা ভাইবোনেরা বড় হচ্ছিলাম? পরিবারের শান্তি-সংহতি নির্ভরই করে পারস্পরিক সম্মানের ও বিশ্বাসের ওপর। কী হত, যদি আমাদের বাবা আর মা পরস্পরকে সম্মান না করতেন? বিশ্বাস না করতেন? ইসলাম বড়ই উঁচু গলায় চিৎকার করে, পারিবারিক মূল্যবোধের সে খুবই যত্ন নেয়। অবশ্যই, অবশ্যই, যত্নটা সে বড়ই নেয়। কিন্তু কীভাবে?
খুলে দেখা যাক খোদ সহিহ্‌ মুসলিম হাদিস থেকে, বই ৮ হাদিস ৩৪৭১:
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেছেন, নবী (দঃ) বলেছেন, বিবি হাওয়া না হলে স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের প্রতি কখনো অবিশ্বাসের কাজ করত না। অর্থাৎ স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের প্রতি অবিশ্বাসের কাজ করে থাকে।
চমৎকার সম্মানের কথা।

বিশ্বাস করুন নারীরা হচ্ছে ক্ষতিকর, শয়তান, এবং বক্র

এভাবেই ইসলাম চিরকালের জন্য মুসলমান মেয়েদের কপাল ফাটিয়ে দিয়েছে। শত পড়াশোনা করলেও, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হলেও, সহস্র আরাধনা করলেও, সারা জীবন চেষ্টা করলেও মেয়েদের উপায় নেই এ কঠিন লক্ষণরেখা পার হবার, পুরুষের সমান হবার। এবং তা শুধুমাত্র, শুধুমাত্র, এবং শুধুমাত্র মেয়ে হবার কারণেই। সাধারণত সাধারণ লোকেরা তাদের স্ত্রীদের ওপর অত্যাচার করে না, সেটা তারা ভালো মানুষ বলেই। কিন্তু প্রতি পদে ইসলামের হুকুম মেনে চললে কুরুক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে দুনিয়া অচল হয়ে যেত, মেয়েদের আর্তনাদ-হাহাকারে সমাজ অচল হয়ে যেত।

ইসলামী বিশ্বকোষ থেকেই দেখা যাক এবারে। সংসার সুখের হবার জন্য স্বামীদের কানে ফিস ফিস করে কিছু তোগলকি উপদেশ দেয়া আছে সেখানে। সে অমূল্য উপদেশগুলো মেনে চললে সুখ তো দুরের কথা, বিভিন্ন রকম হুড় হাঙ্গামায় সংসার শিকেয় উঠতে বাধ্য।

এবারে শুনুন ইসলামী বিশ্বকোষ তার ৬৭৫ পৃষ্ঠায় স্বামীদের কি বলছে:
১. কষ্মিন কালেও স্ত্রীকে বেশী পিরীত দেখাবে না হে, তা হলেই সে কিন্তু লাই পেয়ে মাথায় উঠে সর্বদিকে বিশৃঙ্খল করে দেবে। চিত্ত যদি অতি প্রেমে গদগদ হয়ে ওঠেই, তবে অন্তত: স্ত্রীর কাছে সেটা চেপে রেখো বাপু!

২. বিষয়-সম্পত্তির পরিমাণ তো স্ত্রীকে বলবেই না, অন্যান্য গোপন কথাও লুকিয়ে রেখো সযত্নে। তা না হলেই কিন্তু সে তার দুর্বুদ্ধির কারণে সর্বনাশ করে দেবে সবকিছু।
৩. ও হ্যাঁ, তাকে কখনো কোন বাদ্য-বাজনা করতে দেবে না, আর যেতে দেবে না বাইরেও। পুরুষদের কথা বার্তা তো কিছুতেই শুনতে দেবে না।
হ্যাঁ, এই হল ইসলামে পতিদেবতা, একেবারে পাতি-দেবতা। আগেই দেখিয়েছি স্বামীকে কোরান অনুমতি দিয়েছে ‘বেত্তমিজ’ স্ত্রীকে প্রহার করার। কিন্তু এই শক্তিমান পতিদেবতা নিজেই যদি ব্রক্ষ্মাস্ত্র হাতে হয়ে ওঠেন একেবারে ‘পরশুরামের কঠোর কুঠার’ বা ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, তবে বেচারা স্ত্রী কী করবেন?
উপদেশ আছে সুরা নিসাতে, আয়াত ১২৮ (৪:১২৮):
যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পরের কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গুনাহ নাই।
মীমাংসা উত্তম।

ঐ সুরার ৩৪ নম্বর আয়াতে স্বামীকে কিন্তু মীমাংসার চেয়ে বৌকে ধরে বেদম পিট্টি দেয়াটাকেই আরও উত্তম করে দেয়া আছে।

হাদিসে আছে আরও বিস্তারিত।
সহিহ্‌ বোখারি, ভল্যুম ৭, হাদিস ১৩৪:
সুরা নিসা আয়াত ১২৮ (৪:১২৮) পড়ে আয়েশা বর্ণনা করেছেন: এতে সেই স্ত্রীর কথা বলা হচ্ছে যার স্বামী তাকে রাখতে চায় না, তাকে তালাক দিয়ে অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। সে বলে – অন্য মেয়েকে বিয়ে করো, কিন্তু আমাকে তালাক দিয়ো না, আমার ওপরে খরচও করতে হবে না, আমার সাথে শুতেও হবে না।
এটাই নাকি হল সেই ‘পরস্পরের মীমাংসা উত্তম’।
চমৎকার মীমাংসা-ই বটে।

পনি কি জানেন না পুরুষদের জন্যে বহুগামিতা সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক?

ইসলামে চার বিয়ের কথা সবাই জানে। এটা একটা মারাত্মক নারী-বিরোধী প্রথা।
সুরা নিসা আয়াত নম্বর তিন (৪:৩) বলছে:আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতিম মেয়েদের হক্‌ আদায় করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত।
বিরাট ফাঁকি লুকিয়ে আছে এর ভেতর। মুসলমান পুরুষের জন্য ‘সর্বোচ্চ চার স্ত্রী’ কথাটা কিন্তু ঘোর মিথ্যে। গোপন সত্যটা হল, একসাথে এক সময়ে সর্বোচ্চ চার স্ত্রী। তারপরে যে কোনো স্ত্রীকে বা চারজনকেই এক মুহূর্তে একসাথে তালাক দিয়ে আবার চার মেয়েকে বিয়ে করতে কোনোই অসুবিধে নেই। নবীর (দঃ) নাতি ইমাম হাসান এটা করেছেনও। তাঁর স্ত্রীর সংখ্যা ছিল আশী থেকে তিন’শ, বিভিন্ন বই অনুযায়ী। সাধারণ মুসলমানেরা এটা করেন না, সেটা অন্য কথা। কারণ সব ধর্মের সাধারণ মানুষেরাই ভাল মানুষ। আশ্চর্য কথা হলো: যখন এই আয়াত নাজিল হয়, তখন অনেক লোকের চারের বেশি স্ত্রী ছিল। আল্লার নির্দেশ এসে গেছে সর্বোচ্চ চার, এদিকে ঘরে আছে চারের বেশী। কি করা যায় এখন! নবী (দঃ) কে জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন, পছন্দসই চার জন রেখে বাকী বউগুলোকে তালাক দিয়ে দিতে। ব্যস। ইসলামী বিয়ে-আইনের প্রথম বলি হল সেই নাম না জানা কাব্যে উপেক্ষিতাদের দল, যাদের কোনোই অপরাধ ছিলনা। অথচ তারা এক নিমেষে ঘর হারাল, স্বামী হারাল, আশ্রয় হারাল, সন্তান হারাল।

দেড় হাজার বছর পার হয়ে গেছে, সেই নিরপরাধ হতভাগিনীদের নিঃশব্দ আর্তনাদের জবাব আজও পাওয়া যায়নি। আজও হয়তো সেই ধু ধু মরুভূমির বালুতে কান পাতলে অস্ফুটে শোনা যাবে তাদের চাপা দীর্ঘশ্বাস, ভালো করে খুঁজলে আজও হয়তো বালুতে দেখা যাবে শুকিয়ে যাওয়া ক’ফেটা অশ্রুবিন্দু। আর্ত হাহাকারে তারা শোনাতে চাইবে না বলা সেই করুণ কাহিনী। অথচ কি সহজেই না সমস্যাটার সমাধান হতে পারত!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন