২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২

কুরানে বিগ্যান (দ্বাদশ পর্ব): আবু-লাহাব তত্ত্ব


লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১

বিসমিল্লাহতেই “অভিশাপ”! 

এই সেই বিখ্যাত সুরা লাহাব! সুরা নম্বর ১১১, আয়াত সংখ্যা পাঁচ। 

১১১: ১-৩ - আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে, কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে 

১১১: ৪-৫ - এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে। 

এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত সুরা! দৈনন্দিন নামাজে সাধারণ মুসলমানেরা সুরা ফাতিহার পরেই যে সুরাগুলো সচরাচর পাঠ করেন, এই সুরাটি তাদেরই একটি। একটু মনোযোগের সাথে খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে, এই সুরার পাঁচটি বাক্যের কোথাও বক্তার উল্লেখ নেই। কুরানের বহু বহু আয়াতের মত "বলুন" শব্দটি দিয়েও এর শুরু নয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) উপস্থিত জনতার সামনে দাঁড়িয়ে আবু লাহাব ও তার স্ত্রীকে এই বাক্যগুলো দিয়েই অভিশাপ বর্ষণ করছেন! সবচেয়ে প্রাচীন বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের (ইবনে ইশাক, আল-তাবারী, ইমাম বুখারী) বর্ণনা মতে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছে সেই সময়ে, যখন মুহাম্মদ সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে তার বাণী প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন (এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় পরে আসছি)। 

কে এই আবু লাহাব? 

আবু লাহাবের আসল নাম আবেদ-উজ্জাহ। তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পিতা আবেদ-আল্লাহর (আবদুল্লাহ) নিজের ভাই। মুহাম্মদের দাদা ছিলেন আবেদ-আল মুত্তালেব। আবেদ-আল মুত্তালেব নামটি তার পরিবার প্রাপ্ত কিংবা বংশানুপ্রাপ্ত নাম নয়। এটি একটি উপাধি। আবেদ-আল মুত্তালেব এর আসল নাম ছিল সেইবাহ ইবনে হাশিম। সেইবাহ (Shaybah) শব্দের অর্থ - সাদা চুল। আবেদ আল-মুত্তালিব ('সেইবাহ) এর পিতার (হাশিম) চার ভাই: আবেদ-সামস, নওফল, হাশিম ও আল-মুত্তালিব। তাদের বাবার নাম ছিল আবেদ-মানাফ (মুহাম্মদের দাদার দাদা); হাশিম ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রায়ই মদিনার ওপর দিয়ে সিরিয়া যেতেন। মদিনায় তিনি সালমা বিনতে আমর নামের এক মহিলাকে (খাজরাজ বংশ) বিয়ে করেন। সালমার গর্ভে হাশিমের ঔরসজাত পুত্রটিই হলেন সেইবাহ। সেইবাহ তার মায়ের সাথে মদিনাতেই থাকতেন। সেইবাহর শিশুকালে পিতা হাশিমের মৃত্যু হয়। হাশিমের ভাই আল-মুত্তালিবও ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যেতেন অহরহ। একবার সিরিযা থেকে ফেরার পথে আল-মুত্তালিব সেইবাহকে উঠের পিঠে করে মক্কায় তার নিজের পরিবারে (সেইবাহর পিতৃ-পরিবার) নিয়ে আসেন। মক্কার অধিবাসীরা সেইবাহকে চিনত না। তারা আল-মুত্তালিবের সাথে তারই উঠের পিছনে উপবিষ্ট সেইবাহকে দেখে বলাবলি শুরু করলো, 'এ যে দেখি আল-মুত্তালিবের দাস (আবেদ-আল মুত্তালিব)! সে তাকে কিনে নিয়ে এসেছে।" আল-মুত্তালিব বললেন, "বাজে কথা! এ আমার ভ্রাতুষ্পুত্র। একে আমি মদিনা থেকে নিয়ে এসেছি।" সেই থেকে লোকে সেইবাহ কে 'আবেদ-আল মুত্তালিব' নামেই সম্বোধন করতো (১). আবদ-আল মুত্তালিব (আবদুল মুত্তালিব)-এর বৃহৎ সংসার। তার ছিল পাঁচ স্ত্রী, দশ ছেলে ও সাত কন্যা (২). ছেলেরা হলেন, 

১) স্ত্রী ফাতিমার গর্ভে: আবেদ-আল্লাহ (মুহাম্মদের পিতা), আবু-তালিব (আসল নাম আবেদ-মানাফ) এবং আল-যুবায়ের 
২) স্ত্রী হালার গর্ভে: হামজা (মুহাম্মদের প্রায় সমবয়স্ক), হাজল ও আল-মুকায়িম 
৩) স্ত্রী নাতায়েলার গর্ভে: আল-আব্বাস ও দিরার 
৪) স্ত্রী লুবনার গর্ভে: আবু-লাহাব 
৫) স্ত্রী সামরার গর্ভে: আল-হারিথ 

কন্যারা হলেন: সাফিয়া, উম্মে হাকিম, আল-বেইদা, আতিকা, উমাইয়ামা, আরওয়া এবং বারাহ। মুহাম্মদের আট বছর বয়সে ইয়ামেনে আবদ-আল মুত্তালেবের মৃত্যু ঘটে। 

কী অপরাধ ছিল আবু লাহাবের? 

তার একমাত্র অপরাধ - তিনি তাঁর নিজের ধর্মকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন মুহাম্মদ কুরাইশদের পূজনীয় দেব-দেবীদের তাচ্ছিল্য এবং পূর্ব-পুরুষদের অসম্মান করা শুরু করেছিলেন, তখনই কেবল কুরাইশরা তাদের ধর্ম-রক্ষা ও পূর্ব-পুরুষদের অবমাননার প্রতিবাদেই মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তার আগে কুরাইশরা কখনোই মুহাম্মদের প্রচারণায় বাধা দেন নেই (৩)। 

“When the apostle openly displayed Islam as God ordered him his people did not withdraw or turn against him, so far I (Ibne Humayd) have heard, until he spoke disparagingly of their gods. When he did that they took great offence and resolve unanimously to treat him as an enemy.------”. 

মুহাম্মদের এহেন আগ্রাসী প্রচারণার বিরুদ্ধে আবু লাহাব সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি নির্বোধ ছিলেন না। ছিলেন জ্ঞানী ও সম্ভ্রান্ত। চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর (হিজরতের প্রায় তিন বছর আগে) এই আবু লাহাবই হয়েছিলেন মুহাম্মদের বংশ (হাশেমী) প্রধান। সেই অপরাধে কি আবু লাহাব, আবু সুফিয়ান, উমাইয়া বিন খালফ, আবু জেহেল সহ অন্যান্য কুরাইশদের অপরাধী সাব্যস্ত করা যায়? যদি এর জবাব হয় "না", তবে কুরাইশদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের যাবতীয় বিষোদগার, শাপ-অভিশাপ, তাচ্ছিল্য, শত্রুতা কোনো মহানুভব-বিবেকবান-সৎ মানুষের পরিচয় নয়। সত্য যে তার ঠিক বিপরীত, তা বোঝা যায় অতি সহজেই! যদি এ প্রশ্নের উত্তর হয় "হ্যাঁ, তাহলে সে অপরাধের জন্য মুহাম্মদ ও তার সহকারীরা আরও অনেক অনেক বেশি দায়ী। ক্ষমতা হাতে আসার পরে কুরাইশদের তুলনায় মুহাম্মদ ও তার সহকারীরা আরও অনেক অনেক বেশি উগ্রতা দেখিয়েছিলেন। তার জের চলছে আজও! যে ক্বাবা শরীফে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের ৩৬০ টি মূর্তি ছিল, যার সামনে বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের মানুষ তাদের নিজ নিজ দেব-দেবীদের প্রার্থনা পাশাপাশি বসে করতেন, সেই মক্কা শরীফে আজ অমুসলিমদের প্রবেশ পর্যন্ত নিষেধ! মক্কা শরিফ তো অনেক দূরের কথা, যে কোনো মসজিদ বা মুসলিম সামাজিক অনুষ্ঠানে ইসলাম, কুরান অথবা মুহাম্মদের সমালোচনাকারীর কী পরিণাম হতে পারে তা আমরা সবাই জানি। সমালোচনাকারী যে জীবিত ফিরে আসতে পারবেন না, তা প্রায় নিঃসন্দেহেই বলা যায়। টেরি জোন্স কুরান পোড়ালো আমেরিকায়, আর আফগানিস্তানে তথাকথিত মডারেট মুসলমানদের হাতে খুন হলো নিরীহ ২০ জন মানুষ (ইউ এন কর্মী)।

এটা মুহাম্মদের শিক্ষা। তাঁর জীবনী পড়লেই যে কেউ তা বুঝতে পারবেন। কুরাইশরা মুহাম্মদ এবং তার সাহাবিদেরকে ঠিক কী অত্যাচার করতেন, তার সুনির্দিষ্ট (Specific) উল্লেখ কুরানের কোথাও নাই। কুরাইশরা কোনো মুসলমানকে খুন করেছেন, মরুভূমির মধ্যে বালিতে শুইয়ে রেখে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছেন (বেলালের গল্প), কিংবা কোনো শারীরিক আঘাত করেছেন - সমগ্র কুরানে এমন একটি উদাহরণও নেই। Not a single one! কিন্তু মুহাম্মদ (আল্লাহ) কুরাইশ ও অমুসলিমদের কীভাবে অভিশাপ দিয়েছেন, হুমকি দিয়েছেন, তাদেরকে বাড়ি ঘর থেকে উৎখাত করেছেন, তাদের জান-মাল লুট করে ভাগাভাগি করেছেন (১/৫ মুহাম্মদ এবং ৪/৫ অন্যান্যরা) তার বিষদ বিবরণ কুরানে লিপিবদ্ধ আছে। পরবর্তী পর্বগুলোতে পাঠকরা তা পর্যায়ক্রমে জনাতে পারবেন। 

ঘটনাটি সেই সময়ের, যখন মুহাম্মদ সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে তাঁর মতবাদ প্রচার শুরু করেন। যখন তাঁর কোনো বাহুবলই ছিল না। সে সময়েও মুহাম্মদ তার প্রতিপক্ষকে "অভিশাপ" দিতে দ্বিধান্বিত হননি। এমনকি তাঁর নিকটাত্মীয়ও বাদ পড়েননি। শুধু কি অভিশাপ! হুমকি, শাসানী, ভীতি প্রদর্শন, অসম্মান, দোষারোপ কোনোকিছুই তিনি বাদ রাখেননি। সে সময় তাঁর শক্তি ছিল না প্রতিবাদকারী ঐ সব কাফেরদেরকে শারীরিক বা বৈষয়িকভাবে শায়েস্তা করার! থাকলে তিনি তাদের যে কি হাল করতেন, তার নমুনা ইতিহাস হয়ে আছে শক্তিমান মুহাম্মদের মদিনার বাণী ও কর্মকাণ্ডে! অল্প কিছু উদাহরণ (৪)

১. প্রতারণার (Taqya) মাধ্যমে রাতের অন্ধকারে পেশাদার খুনি/সন্ত্রাসী কায়দায় ক্বাব বিন আশরাফ-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ড,
সহি বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নং ৩৬৯
(অংশ বিশেষ) “Narrated Jabir bin 'Abdullah: Allah's Apostle said, "Who is willing to kill Ka'b bin Al-Ashraf who has hurt Allah and His Apostle?" Thereupon Muhammad bin Maslama got up saying, "O Allah's Apostle! Would you like that I kill him?" The Prophet said, "Yes," Muhammad bin Maslama said, "Then allow me to say a (false) thing (i.e. to deceive Kab). "The Prophet said, "You may say it. 
... Muhammad bin Maslama requested Ka'b "Will you allow me to smell your head?" Ka'b said, "Yes." Muhammad smelt it and made his companions smell it as well. Then he requested Ka'b again, "Will you let me (smell your head)?" Ka'b said, "Yes." When Muhammad got a strong hold of him, he said (to his companions), "Get at him!" So they killed him and went to the Prophet and informed him. (Abu Rafi) was killed after Ka'b bin Al-Ashraf." 
২. রাতের অন্ধকারে পেশাদার খুনি/সন্ত্রাসী কায়দায় আবু আফাককে নৃশংস ভাবে খুন,
সহি বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নম্বর ৩৭১
(অংশ বিশেষ) “ Narrated Al-Bara bin Azib: Allah's Apostle sent some men from the Ansar to ((kill) Abu Rafi, the Jew, and appointed 'Abdullah bin Atik as their leader. Abu Rafi used to hurt Allah's Apostle and help his enemies against him. ------ ' So I reached him and found him sleeping in a dark house amidst his family, I could not recognize his location in the house. So I shouted, 'O Abu Rafi!' Abu Rafi said, 'Who is it?' I proceeded towards the source of the voice and hit him with the sword, and because of my perplexity, I could not kill him. He cried loudly, and I came out of the house and waited for a while, and then went to him again --- I again hit him severely but I did not kill him. Then I drove the point of the sword into his belly (and pressed it through) till it touched his back, and I realized that I have killed him. ----- Thereupon --- I (along with my companions proceeded and) went to the Prophet and described the whole story to him..."
 
৩. পাঁচ সন্তানের মা আসমা-বিনতে মারিয়া কে খুন,

কী তাঁর অপরাধ? মুহাম্মদের নৃশংস কাজের প্রতিবাদ করে তিনি "কবিতা" লিখেছিলেন! হ্যাঁ, কবিতা! 
(ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৭৫-৬৭৬) 
(অংশ বিশেষ) “ ---When the apostle heard what she had said he said, "Who will rid me of Marwan's daughter?" `Umayr b. `Adiy al-Khatmi who was with him heard him, and that very night he went to her house and killed her. In the morning he came to the apostle and told him what he had done and he [Muhammad] said, "You have helped God and His apostle, O `Umayr!" When he asked if he would have to bear any evil consequences the apostle said, "Two goats won't butt their heads about her", so `Umayr went back to his people.”
 
৪. বানু কুরাইজার গণহত্যাযজ্ঞ,
ক) ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৪৬১-৪৬৯
(অংশ বিশেষ) “-----The apostle of Allah imprisoned the Qurayza in Medina while trenches were dug in the market place. Then he sent for the men and had their heads struck off so that they fell in the trenches. They were brought out in groups, and among them was Kab, the chief of the tribe. In number, they amounted to six or seven hundred, although some state it to have been eight or nine hundred. All were executed..."
খ) সহি বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নং ৪৪৭-৪৪৯।      সুন্নাহ আবু দাউদ, বুক ৩৮, নং ৪৩৯০ 
গ) মুহাম্মদের (আল্লাহ) বর্ণনা:
৩৩:২৬ - কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফেরদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দূর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন। ফলে তোমরা একদলকে হত্যা করছ এবং একদলকে বন্দী করছ।
 
৩৩:২৭ - তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘর-বাড়ীর, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খন্ডের মালিক করে দিয়েছেন, যেখানে তোমরা অভিযান করনি।  
ইবনে ইশাক, সহি বুখারী ও আবু দাউদের সার সংক্ষেপ: 

কেন এই রক্তের হোলী-খেলা? 

“আপাদ মস্তক ধুলা-ভর্তি শরীরে অস্ত্রসজ্জিত অশরীরী জিবরাইল তার মাথার চুলের ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে এসে খন্দক যুদ্ধ প্রত্যাবর্তনকারী সদ্য স্নান-সম্পন্ন মুহাম্মদকে আক্রমণের আহ্বান জানালেন। জিবরাইলের প্রশ্ন, "কেন তুমি অস্ত্র বিরতি দিয়েছ? আল্লাহর কসম, আমি তো তা করি নাই। যাও তাদের আক্রমণ কর।" মুহাম্মদ জানতে চাইলেন, "কোথায়"? জিবরাইল তখন বনি কুরাইজার দিকে নির্দেশ করলো। জিবরাইলের নির্দেশে আল্লাহর নবী তার দল বল নিয়ে বনি কুরাইজা আক্রমণ ও ঘেরাও করলেন। নবী তার সহচর হাসান বিন তাবিতকে বললেন, "তাদেরকে গালি-গালাজ করো। স্বয়ং জিবরাইল এই গালি-গালাজে তোমার সাহায্যে আছে।"

তারপর বনি কুরাইজার গোষ্ঠী আত্ম সমর্পণ করলে, আত্ম-সমর্পিত অবস্থাতেই বনি কুরাইজার সমস্ত "প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের" (৭০০-৯০০ জন) প্রকাশ্য দিবালোকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারের নিকট পূর্ব থেকে খুঁড়ে রাখা গর্তের কিনারায় একের পর এক সারিবদ্ধ ভাবে নিয়ে এসে একটা একটা করে 'গলা কেটে খুন করে লাশগুলো গর্তে নিক্ষেপ করা হয়। কে প্রাপ্তবয়স্ক আর কে তা নয়, তা পুরুষাঙ্গের লোম (pubic hair) দেখে হয়েছিল নির্ধারণ! তাদের সমস্ত সম্পত্তি মুহাম্মদ হস্তগত করেন। তাদের যুবতী স্ত্রী-কন্যাদের করেন তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের যৌন দাসী। বয়োবৃদ্ধ পুরুষ ও নারী এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুদের করেন দাসে রূপান্তরিত। মুহাম্মদের দাবি, এই নৃশংস অমানবিক হত্যাকাণ্ড, সম্পত্তি দখল, উদ্ভিন্নযৌবনা মেয়ে দখল এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক (যারা কোনো অন্যায় করেনি) মুক্ত মানুষদের চিরদিনের জন্য দুঃসহ দাসত্বের শৃঙ্খলে রূপান্তরিত করা "আল্লাহর" পছন্দ!” 

পাঠক, অল্প কিছুদিন আগে প্রকাশ্য দিবালোকে উন্মুক্ত জনতার সামনে সৌদি আরবে একজন বাংলাদেশীর শিরশ্ছেদের 'বীভৎস’ ভিডিও দৃশ্যটি ইন্টারনেটে দেখে অনেক দর্শকই অসুস্থ বোধ করেছিলেন। সে তুলনায় বনি কুরাইজার ঘটনা লক্ষ গুণ বেশি বীভৎস ও জঘন্য (খুন-ধর্ষণ-লুট-দাসত্ব)! বনি-কুরাইজা ঘটনার উল্লিখিত বর্ণনার লেখকগণ বিশিষ্ট আদি মুসলিম চিন্তাবিদ। তাদের এ বর্ণনার "উৎসে" যাঁরা ছিলেন (যাঁদের কাছ থেকে গল্প গুলো সংগৃহীত), তাঁদের সকলেই প্রচণ্ড বিশ্বাসী বিশিষ্ট মুসলিম। ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাঁরা তাঁদের বর্ণনায় এমন কিছু উল্লেখ করার ক্ষমতা রাখেন না, যা "মুহাম্মদকে হেয় প্রতিপন্ন' করতে পারে। সে ক্ষমতা তাঁদের নেই। কেন নেই, তার বিস্তারিত আলোচনা জ্ঞান পর্বে (দশম) করা হয়েছে। এ সকল বর্ণনা লেখা হয়েছে মুহাম্মদের মৃত্যুর ১২০-২২০ বছরের ও বেশি পরে। লেখক ও বর্ণনাকারীরা সেই সময়েরই বাসিন্দা, যখন মানুষের "মানসিক বিভ্রম (Psychosis)" সম্বন্ধে সামান্যতম ধারণাও ছিল না। তাদের বিশ্বাস ছিল "এ বিভ্রমগুলো এক বিশেষ ক্ষমতা!" তাই এ উদ্ভট বর্ণনাগুলো এই ভয়াবহ গণহত্যাকাণ্ডের ন্যায্যতার সপক্ষে বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা জানতেন না যে, শত-সহস্র বছর পরে তাঁদের লিখিত এই ঘটনাগুলো মুহাম্মদ ও তার সহচরদের অমানবিক কর্মকাণ্ডের "উল্লেখযোগ্য" দলিল হিসাবে চিহ্নিত হবে।

বলা হচ্ছে, “জিবরাইল তার চুলের ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে এসে" মুহাম্মদকে খবর দিয়েছেন। আর কেউ কি জিবরাইলকে দেখেছে? না, কেউ না! দেখেছে একমাত্র মুহাম্মদ! আর কেউ কি তার হুংকার শুনেছে? না, কেউ না! একমাত্র মুহাম্মদই তা শুনেছেন! বিজ্ঞানের অবদানে আজ আমরা নিশ্চিতরূপে জানি যে, এই উপসর্গগুলো আদর্শ (Typical) দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির বিভ্রম (hallucination) ছাড়া আর কিছুই নয়। এ সকল উপসর্গ ভয়ংকর মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত রুগীদের (উন্মাদ)। বিশেষ করে যারা এ রূপ 'Command hallucination" এ আক্রান্ত। এ উপসর্গের সাথে প্রায়ই যোগ হয় সন্দেহ-বাতিক (Paranoid delusion) এবং তখন তা হয় আরও বিপজ্জনক ও মারাত্মক (deadly)। রুগী ও তার পরিপার্শ্বের মানুষদের নিরাপত্তার খাতিরে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে তৎক্ষণাৎ (Psychiatric emergency) এ সকল উন্মাদ রোগীকে মানসিক হাসপাতালের "তালাবদ্ধ (Locked unit) কক্ষে" ভর্তি করা হয়। বিষয়টি এতই জরুরী যে, এ সমস্ত রোগী যদি হাসপাতালে ভর্তি হতে অসম্মতি প্রকাশ করে, তাহলে তাকে আইন শৃঙ্খলা/নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় জবরদস্তিরূপে (Involuntary commitment) হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, মুহাম্মদ কি আদৌ উন্মাদ ছিলেন? কোনো উন্মাদ ব্যক্তি কি নিখুঁত ও সময়োচিত পরিকল্পনা করে জগৎ বিখ্যাত সমরনায়ক হতে পারেন? খুবই যুক্তিসম্মত প্রশ্ন! মুহাম্মদ যে মানব ইতিহাসের একজন সফল সমরনায়ক (Warrior), এ সত্যকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। তাই এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের "অধিকাংশ সময়ে" মানসিক বিভ্রমে আক্রান্ত কোনো মানুষের পক্ষে এহেন হিসেবী পদক্ষেপ অসম্ভব! সুতরাং, “ক্বচিৎ কদাচিৎ” মতিভ্রম অথবা মৃগী (Epilepsy) উপসর্গে আক্রান্ত হলেও জীবনের অধিকাংশ সময়ই মুহাম্মদ যে শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন না, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তিনি যা কিছু করেছেন সজ্ঞানে করেছেন। ওহী প্রাপ্তির উপসর্গ থেকে শুরু করে জিবরাইল ও জ্বিনের দর্শন/শ্রবণসহ তাঁর জীবনের সমস্ত কার্যকলাপই করেছেন ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে! All are goal directed activities. বনি কুরাইজার ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়! কুরান-সিরাত হাদিসের আলোকে সে সত্যটি আজ স্পষ্ট। উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে তিনি যে "মিথ্যা ও প্রতারণার" আশ্রয় নিতেন, তার প্রমাণ ভুরিভুরি (ওপরের দৃষ্টান্ত)! 

মানবতার মাপকাঠিতে মুহাম্মদ কখনোই "শ্রেষ্ঠ মানব" ছিলেন না। তাঁর নিজেরই জবানবন্দী (কুরান)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত সাক্ষ্যবাহী। কিন্তু মুহাম্মদ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ "সফলকাম" ব্যক্তিদের একজন। তিনি আরবের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন গোত্রকে ইসলাম নামের ‘পতাকাতলে' সমবেত করে এক শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সহচররা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে 'আরব সাম্রাজ্যবাদ" কায়েম করেন। মুহাম্মদের সাংগঠনিক দক্ষতা, কারিশমা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, চতুরতা, লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়তা এবং সর্বোপরি নৃশংস সন্ত্রাসী (terror) কর্মকাণ্ডই (বুখারী: ৪:৫২:২২০) ছিল তার সাফল্যের চাবি কাঠি। তিনি ছিলেন চতুর পলিটিশিয়ান। তার নীতি ছিল, "The end justifies the means". লক্ষ্য অর্জনে যা কিছু প্রয়োজন, সবই তিনি করেছেন তাঁর কল্পিত আল্লাহর নামে। অমুসলিমদের প্রতি যাবতীয় নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা, খুন, সন্ত্রাস, প্রহসন, ঘৃণা, লুট, ধর্ষণ, ভীতি ও প্রলোভন (দুনিয়া ও আখিরাত) সবই বৈধতা পেয়েছে তাঁর সে নীতিতে। সাধারণ মুসলমানেরা ইসলামের আদি উৎসে বর্ণিত এ সব অমানবিক ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ! পরিকল্পিতভাবে তা গোপন রাখা হয়েছে, অথবা বৈধতা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কসরতের মাধ্যমে! যুগে যুগে যরাই এ সত্যকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন তাদেরকেই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক যাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়েছে। 

ইসলাম বিশ্বাসীদের বহুল প্রচারিত ও প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, বনি কুরাইজা খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য করেছিলেন বলেই মুহাম্মদ তাদের কে আক্রমণ ও খুন করেছিলেন। তাদের এই বিশ্বাস যে কী পরিমাণ “নির্লজ্জ ও মিথ্যা অপ-প্রচারণার ফসল” তার সাক্ষী কুরান হাদিসের বর্ণনা। যে মুহাম্মদ শক্তি না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তাঁর সাথে ভিন্নমতের কারণে নিজের নিকট আত্মীয়কে অভিশাপ দেন, ক্বাব, আবু-রাফি এবং সামান্য কবিতা লেখার অপরাধে "জননীকে" করেন খুন। মক্কা বিজয়ের পর দশ জন পুরুষ ও নারীকে (অপরাধ: দশ বছরেরও বেশি আগে তাঁরা তাঁকে ব্যঙ্গ করেছিলেন) যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই (এমনকি তা যদি ক্বাবার মধ্যেও হয়) খুন করার রায় দেন; সেই একই মুহাম্মদ তাঁর শত্রুপক্ষকে সাহায্যকারী বনি কুরাইজার “দুশমনি" বেমালুম ভুলে গিয়ে বাসায় এসে "গোসল করতেছেন!” এমনকি জিবরাইল এসে তাঁকে তা মনে করিয়ে দেয়ার পরও বুঝতে না পেরে জিবরাইলকেই জিজ্ঞাসা করছেন, "কোথায় তাকে আক্রমণ করতে হবে!” এ সব উদ্ভট বর্ণনার মাধ্যমে বনি কুরাইজাকে "দোষী সাব্যস্ত করার কসরত" আরব্য উপন্যাসের গল্পকেও হার মানায়। বানু-কুরাইজার অত্যন্ত করুণ এই ঘটনা মুহাম্মদের বহু বহু নিষ্ঠুরতার একটি। বনি কুরাইজার কোনো সদস্য মুহাম্মদ কিংবা মুসলমানদের কোনোরূপ আক্রমণ করেননি। They never attacked Muslims! সত্য হচ্ছে, বনি কুরাইজা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ 'সম্পত্তি-নারী-দাস' দখল (৩৩:২৭)! 

Let us forget about everything! পাঠক, আসুন, আমরা যুক্তির খাতিরে ধরে নিই যে, এ সব "উদ্ভট আরব্য-উপন্যাসীয় বর্ণনা” সবই সত্য! বনি কুরাইজা তাদের দুর্গের মধ্য থেকে কুরাইশদেরকে সাহায্য করেছিলেন, যা মুহাম্মদ ভুলে গিয়েছিলেন এবং জিবরাইলের মারফত তা জ্ঞাত হয়েছেন। সে অপরাধে তাদের প্রত্যেকেটি প্রাপ্ত-বয়স্ক পুরুষকে আত্ম সমর্পিত ও বন্দী অবস্থায় খুন, ভূমি দখল, শিশু (নিষ্পাপ) ও আবাল বৃদ্ধ বনিতাদের দাসে রূপান্তরকারীকে কি কোনোভাবে "অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী (৬৮:৪)", কিংবা "বিশ্ববাসীর রহমত (২১:১০৭)", কিংবা, "মানব জাতির ত্রাণকর্তা (৩৪:২৮)" ইত্যাদি বিশেষ বিশেষণে ভূষিত করা যায়? যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এমন দাবি করেন, তাঁদেরও কি আদৌ সুস্থচিন্তার অধিকারী ও বিবেকবান বলা যায়? 

"নিকট আত্মীয়কে অভিশাপ" এর মাধ্যমে ইসলামের প্রকাশ্য যাত্রার শুরু 

পাঠক, আসুন, আমরা আবু লাহাব কে কী কারণে "অভিশাপ" দেয়া হয়েছিল তা নির্মোহ মানসিকতা নিয়ে পর্যালোচনা করে "সত্য" অুনধাবনের চেষ্টা করি। ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), ইমাম বুখারী (৮১০-৮৭০ খৃষ্টাব্দ) ও আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ খৃষ্টাব্দ) বর্ণনা মতে "সুরা লাহাব" নাজিল হয় মুহাম্মদের নবুয়ত প্রাপ্তির বছর তিনেক পরে। মুহাম্মদ তার নবুয়ত প্রাপ্তি ঘোষণার প্রথম তিন বছর (৬১০-৬১৩ সাল) তার বাণী প্রচার করেন গোপনে। এই সুরার শানে নজুলে বলা হয়েছে যে মুহাম্মদ “সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে” তার বাণী প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন “আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন (২৬:২১৪)” ওহী প্রাপ্তির পর পরই। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ (৫)
সহি বুখারী: ভলিউম-৬, বই-৬০, নং-২৯৩
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত,
'আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন (২৬:২১৪)' আয়তটি অবতীর্ণ হওয়ার পর নবী সাফা পাহাড়ের উপর উঠে "হে বনি ফিহির! হে বনি আদি"  এভাবে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে সেখানে সমবেত হওয়ার আগ পর্যন্ত ডাকতেই থাকলেন। যারা সমাবেশে আসতে পারলেন না, তারা তাদের নিজস্ব সংবাদদাতা পাঠালেন সেখানে কী ঘটেছে, তা জানার জন্য। আবু লাহাব ও অন্যান্য কুরাইশরা সেখানে সমবেত হলে নবী বললেন, "যদি আমি বলি যে, একদল শত্রুসেনা তোমাদেরকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থান নিয়েছে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?" উপস্থিত কুরাইশরা বললেন, "হ্যাঁ, কারণ আমরা আপনাকে সর্বদাই সত্যবাদী বলে জানি।" তারপর নবী বললেন, "আমি তোমাদেরকে চরম শাস্তির (terrific punishment) সতর্কতাকারী।" আবু লাহাব (নবীকে) বললেন, "ধ্বংস হোক তোমার হাত! এ কারণেই কি তুমি আমাদেরকে ডাকাডাকি করে একত্রিত করেছ?" তখন নাজিল হলো:" আবু লাহাবের (নবীর চাচা) হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে, কোনো কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে ---(১১১: ১-৫)”।
- (অনুবাদ: লেখক) 
মুহাম্মদের চরিত্র বোঝার জন্য এ সুরাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ কেমন লোক ছিলেন, তার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় এই সুরা লাহাব ও তার শানে-নজুলের বর্ণনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ঘটনার বিশ্লেষণে আমরা জানছি:

১) মুহাম্মদ সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে তার মতবাদ প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, “আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন” ধারনাটি পাওয়ার পর। সেই অনুষ্ঠানেই মুহাম্মদ তার একান্ত নিকট আত্মীয়কে অভিশাপ বর্ষণ করেন। অর্থাৎ, ইসলামের প্রকাশ্য যাত্রার প্রারম্ভই হয়েছে "অভিশাপ বর্ষণ"-এর মাধ্যমে! 

২) মুহাম্মদ সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তার আসল উদ্দেশ্য গোপন রেখে বিনা নোটিশে বিভিন্ন গোত্রের কুরাইশদেরকে সেখানে সমবেত না হওয়া পর্যন্ত ডাকাডাকি করেছিলেন। 

৩) তারপর লোকজন 'কী ব্যাপার', তা জানার জন্য সমবেত হলে প্রথমে তিনি তাদেরকে শত্রুপক্ষ আক্রমণের ভীতি প্রদর্শন করেন। এহেন ঘোষণায় কুরাইশদের ভীত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এমত ঘোষণাকারীকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। তা সে চরম সত্যবাদী বা সাধারন সত্যবাদী যে-ই হোক না কেন। কারণ শত্রুপক্ষের আক্রমণ সে আমলে কোনো অবাস্তব বিষয় ছিল না। যে কোনো সাধারণ ব্যক্তি এমত ঘোষণাকারী হলেও তাকে অবিশ্বাস করে 'আক্রান্ত হবার" ঝুঁকি কোনো জনপদই নেবে না। তবে ব্যক্তিটি যদি সে জনপদের সর্বজনবিদিত "মিথ্যুক" হোন, সেক্ষেত্রে হয়তো এর ব্যতিক্রম হলেও হতে পারে। নতুবা নয়। তাই সহি বুখারীর এই হাদিসটির বর্ণনায় উপস্থিত কুরাইশদের "হ্যাঁ" জবাবটির জন্য "কারণ আমারা আপনাকে সর্বদাই সত্যবাদী বলে জানি" একান্তই অনাবশ্যক। 

৪) তারপর তিনি কুরাইশদের তাঁর কল্পিত আল্লাহর "চরম শাস্তির হুমকি” প্রদর্শন করে তাঁর মতবাদ মেনে নেয়ার আহ্বান জানান। 

৫) মুহাম্মদের এহেন শঠতায় (আসল উদ্দেশ্য গোপন রেখে বিনা নোটিশে বিভিন্ন গোত্রের কুরাইশদেরকে ডাকাডাকি করে লোক সমাগম, ভীতি প্রদর্শন ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে নিজের দলে টানার চেষ্টা) আবু লাহাব ক্রোধান্বিত হয়ে কঠোরভাবে প্রতিবাদ করেন। 

৬) মুহাম্মদ তার ব্যবহারে কোনোরূপ অস্বাভাবিকতা শুধু যে দেখতে পাননি, তাইই নয়, উল্টা আবু লাহাবকে তাঁরই উচ্চারিত বাক্য দিয়ে "অভিসম্পাত" করেন। একই সাথে আবু লাহাবের স্ত্রীকেও করেন অভিসম্পাত। 

এই পুরো ঘটনাটির জন্য দায়ী মুহাম্মদ! তিনিই কুরাইশদের ডাকাডাকি করে প্রথমে "শত্রু আক্রমণের ভয়" এবং পরে তাঁর দলে শরীক না হলে "চরম শাস্তির ভয়" দেখান। এমত পরিস্থিতিতে কেউ যদি "আহ্বানকারীর" ওপর বিরক্ত হন, তবে সেটার দায় কার? আহ্বানকারীর? নাকি প্রতিবাদকারীর? নিঃসন্দেহে আহ্বানকারীর। এই সহজ সত্যটি যারা বুঝতে অক্ষম, তাদেরকে অনুরোধ করি কল্পনা করতে যে, তার এলাকায় একইভাবে কোনো আহ্বানকারী এসে বিনা নোটিশে তাকে এবং তার এলাকাবাসী বিভিন্ন গণ্যমান্য মুসলমানদের হাঁকাহাঁকি করে ময়দানে ডেকে নিয়ে "ইসলাম একটি ভুয়া বিশ্বাস এবং তাদের জন্য অপেক্ষা করছে জাহান্নামের অনন্ত আগুন" ঘোষণা দিয়ে আহ্বানকারীর আবিষ্কৃত কোনো এক ‘নতুন ধর্ম’ গ্রহণের ক্যানভাস শুরু করলেন। তারপর সমাগমে আগত কোনো একজন বিরক্তি প্রকাশ করে তার কাজের প্রতিবাদ করলে তিনি উল্টা সেই প্রতিবাদকারীকে অভিশাপ দিলেন। প্রতিবাদকারীর স্ত্রীকে অভিশাপ দিলেন। তারপর, তার সমর্থকরাও যেন সেই প্রতিবাদকারী ও তার স্ত্রীকে অনন্তকাল ধরে অভিশাপ দেন, তার ব্যবস্থাও করলেন! জারী করলেন যে, এ অভিশাপ মিশ্রিত বাণী 'তেলাওয়াত' করলেও অশেষ পুণ্য মিলবে! এমন মানসিকতা ও চরিত্রের অধিকারী আহ্বানকারীকে কি সৎ, সহিষ্ণু, বিবেকবান, নীতিবান ইত্যাদি যাবতীয় গুনে গুণান্বিত ব্যক্তি হিসাবে "ভূষিত" করা যায়? "বিবেচনা"ও কি করা যায়? কিংবা "কল্পনা"? 

যতদিন 'ইসলাম' টিকে থাকবে, বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান মুহাম্মদের চাচা ও চাচীকে অভিসম্পাত করতেই থাকবেন পরম একাগ্রতায়। 'ঐশী বাণী' বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানসে সকল ঐশী বাণীই পবিত্র। পালিত হয় তা একাগ্রচিত্তে! হোক না তা ঘৃণা বা অভিশাপ! কিংবা হুমকি, শাসানী, ভীতি প্রদর্শন, অসম্মান বা দোষারোপ! অথবা ত্রাস, হত্যা, হামলা ও সম্পর্কচ্ছেদের আদেশ। মানবমস্তিষ্কে "বিশ্বাস" এমন একটি অবস্থান (Condition), যা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি-বিশ্লেষণ বৃত্তিকে অবশ করে দেয়। আমি নিজে খুব ভাল বিশ্বাসী ছিলাম জীবনের অনেকগুলো বছর (৬). জানতাম কম, মানতাম বেশি। যেটুকু জানতাম তার কোথাও "অসামঞ্জস্য"-এর কোনোকিছুই ধরতে পারতাম না। যাঁরা তা ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন, তাদের সাথে তর্কে মেতে উঠতাম। ইসলাম সত্য, কুরান সত্য, মুহাম্মদ সত্য। এর বাহিরে সবকিছুকেই "মিথ্যা" বলে মনে হতো। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের আলোকে সত্যকে আবিষ্কার করতে ভাবনার নিরপেক্ষতা (unbiased thinking) অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বাস ও ভাবাবেগ (Emotion) সহজাত বিচার বুদ্ধির অন্তরায়। 

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হেরেম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া; অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে।

(চলবে) 

-------------------------------------- 

References: 

(১) Al Tabari (839-923 CE) - “Tarikh Rasul Wal Muluq”. Translated and Annoted by W Montgomery Watt and M. V. McDonald – Volume VI- page 1083-84 

Ibne Ishaq page- 59 

(২) Ibne Hisham (d 833 CE) ‘Sirat Rasul Allah -by Ibne Ishaq (704-768)
ed M al Saqqa et al, Cairo, 1936. Translated by A. Guillaume- page 46 

(৩) Ibne Ishaq as above, Page (Leiden) 166-168) - 

Al- Tabari as above, page (Leiden) 1175 -1177 

(৪) অল্প কিছু উদাহরণ

১) ক্বাব বিন আশরাফ নৃশংস হত্যাকাণ্ড - বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নং ৩৬৯ 

২) আবু আফাক নৃশংস হত্যাকাণ্ড - বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নম্বর ৩৭১ 



Ibne Ishaq as above- Page number (Leiden) 685-699 



Ibne Ishaq as above- Page number (Leiden) 166 

Al- Tabari as above, page (Leiden) 1170 -1171 

(৬) ভিডিও: ৫ মিনিট

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন