২৪ জুলাই, ২০১২

কুরানে বিগ্যান (পঞ্চম পর্ব): দেহ-তত্ব


লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪

করুণাময় আল্লাহ!

একটি বিশেষ ঘোষণা

অবিশ্বাসীদের প্রতি বিশেষ চ্যালেঞ্জ,
৪:৮২- এরা কি লক্ষ্য করে না কোরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অপর কারও পক্ষ থেকে হত, তবে এতো অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত-

কুরানের বাণীর প্রবক্তা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। কিন্তু মুহাম্মদের দাবী - বাণীগুলো তার নয়, বিশ্ব-স্রষ্টার। যেমন করে অনেক "আধ্যাত্মিক গুরু" দাবী করে যে, তাদের মুখের বাণী তাদের নয়। তাদের ওপর ভর করা আত্মা (Spirit), জ্বিন, ভূত অথবা ঈশ্বরের। আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-ও তার ব্যতিক্রম নয়! দাবীর সপক্ষে তার এই বিশেষ ঘোষণাটি (৪:৮২)! বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টার (যদি থাকেন-Deist view), বাণীতে কখনোই কোনো ভুল, অবৈজ্ঞানিক, অবাস্তব অথবা অসামঞ্জস্য থাকতে পারে না (অসম্ভব প্রস্তাবনা!)। শুধু “একটি মাত্র বৈপরীত্য” থাকলেই ১০০% সুনিশ্চিত ভাবে বলা যাবে কুরান বিশ্ব-স্রষ্টার বানী নয়, মুহাম্মদের দাবী মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অথবা মানসিক বিভ্রম (Psychosis)। 'কুরানে বিগ্যান'-এ সঙ্কলিত বাণীগুলো পর্যবেক্ষণে সত্যানুসন্ধান সহজতর। হে পাঠক, কোনো “বৈপরীত্য” দেখতে পান কি? মনে রাখবেন, "একটি মাত্রই যথেষ্ট, দুইটি অতিরিক্ত!"

মানুষ চিন্তাশীল। জানতে চায় সে সবকিছু। জানতে চায় সে নিজেকে! কোথা থেকে সে এসেছে? কী উপকরণে সে তৈরি? কীভাবে সে সৃষ্টি হলো? হযরত মুহাম্মদ (সা:) মহাজ্ঞানী আল্লাহর উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষ সৃষ্টির উপকরণের বর্ণনা দিয়েছেন। কী সে উপকরণ?

১) মাটি

:-  তিনিই তোমাদেরকে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অত:পর নির্দিষ্টকাল নির্ধারণ করেছেন| আর অপর নির্দিষ্টকাল আল্লাহর কাছে আছে| তথাপি তোমরা সন্দেহ কর
২০:৫৫ - মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃজন করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিব এবং পুনরায় থেকেই আমি তোমাদেরকে উত্থিত করব।
৩০:২০, ৩৮:৭১, ৫৩:৩২, ৭১:১৭ - অনুরূপ বাণী*

কী ধরনের মাটি?

) বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি
১৫:২৬ - আমি মানবকে পচা কর্দম থেকে তৈরী বিশুস্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি।  
৫৫:১৪ -তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে। 
) কাদামাটি থেকে
৩৭:- - যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।  
) এঁটেল মাটি থেকে
৩৭:১১ - আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, তাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আমি অন্য যা সৃষ্টি করেছি? আমিই তাদেরকে সৃষ্টি করেছি এঁটেল মাটি থেকে।  
) মাটির সারাংশ
২৩:১২ - আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।

) পানি

২১:৩০কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?  
২৫:৫৪তিনিই পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন মানবকে, অতঃপর তাকে রক্তগত, বংশ বৈবাহিক সম্পর্কশীল করেছেন। তোমার পালনকর্তা সবকিছু করতে সক্ষম। 
২৪:৪৫-   অনুরূপ বাণী

৩) এক ফোঁটা বীর্য

১৬:৪, - তিনি মানবকে এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। এতদসত্ত্বেও সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী হয়ে গেছে।  
৭৬: -আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি  মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।  
৩৬:৭৭, ৭৭:২০,   ৫৩:৪৫-৪৬, ৮০:১৮-১৯, ৮৬:- - অনুরূপ বাণী  

৪) মাটি, অতঃপর বীর্য

১৮:৩৭তার সঙ্গী তাকে কথা প্রসঙ্গে বললঃ তুমি তাঁকে অস্বীকার করছ, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, অতঃপর বীর্য থেকে, অতঃপর র্পূনাঙ্গ করেছেন তোমাকে মানবাকৃতিতে?  
৩৫:১১- আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, অতঃপর বীর্য থেকে, তারপর করেছেন তোমাদেরকে যুগল। কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসব করে না; কিন্তু তাঁর জ্ঞাতসারে। --

চিন্তাশীল মানুষের জ্ঞান পিপাসা লাঘবে আল্লাহ পাক মানুষ সৃষ্টির উপকরণগুলো কী "চমৎকার" ভাবেই না বর্ণনা করেছেন! যা খালি চোখে দেখা যায়, এমন সম্ভাব্য কোনোকিছুই তিনি বাদ রাখেননি! বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি, কাদামাটি, এঁটেল মাটি, মাটির সারাংশ, পানি, বীর্য, মাটি অতঃপর বীর্য। বোঝা যায়, পৌত্তলিকরা যেমন করে "মাটি ও পানি" দিয়ে মূর্তি বানায়, আল্লাহও আদমকে ঠিক তেমনি ভাবেই বানিয়েছেন! এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নাই। বিশেষ করে প্রিয় নবীর জন্ম ও বৃদ্ধি যখন পৌত্তলিক পরিবেশেই, তা তার অজানা নয়।! আর ‘বীর্য (Semen) যে সন্তান উৎপাদনের জন্য অবশ্য, অত্যাবশ্যক তা সর্বজনবিদিত। একমাত্র প্রচণ্ড মানসিক প্রতিবন্ধী (Severely mentally retarded) ও শিশুরা ছাড়া কারুরই তা অজানা নয়। কিন্তু পুরুষের বীর্যের মত মেয়েদের "ডিম্বাণুও (Ovum)" যে সন্তান উৎপাদনের জন্য অবশ্য অত্যাবশ্যক সে ব্যাপারে মহাজ্ঞানী আল্লাহ পাক “একটি বাক্যও” বর্ষণ করেন নাই! বীর্যের কথা আল্লাহ পাক বহুবার ঘোষণা দিয়েছেন কিন্তু বীর্যে "শুক্রাণুর” অস্তিত্বের বিষয়েও তিনি “একটি বাক্যও" বর্ষণ করেন নাই! কেন? দু'টি সম্ভাব্য কারণ:

১) মৌনতা
হুজুরে পাক (সাঃ) দাবী করেছেন যে, "আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ তার প্রতি রহমত প্রেরণ করেন (৩৩:৫৬)।" অন্য যে কোনো ব্যক্তি যদি এই একই দাবী নিয়ে হাজির হন, তবে আজকের যে কোনো আধুনিক চিকিৎসক সে ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ "উন্মাদ (Psychotic)” [স্কিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) রোগের লক্ষণ] সাব্যস্ত করতো। কিন্তু ধর্ম-শাস্ত্রে এসকল উপসর্গের অধিকারীদের বলা হয় "কামেল"। আর মহাকামেল সেই ব্যক্তি, যার এ উপসর্গটি (delusion and hallucination) সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ ও উৎকট। 
স্বপ্নকে সত্য জ্ঞানে নিজেরই অবুঝ শিশু পুত্রের গলায় যে নির্দ্বিধায় ছুরি চালাতে পারে (মহানবী ইবরাহীম) অথবা অশরীরী 'জিবরাইলের' মারফত খবর প্রাপ্ত (বুখারী ৫:৫৯:৪৪৩) হয়ে (visual and auditory Hallucination) দলবল নিয়ে অসহায় ৬০০-৯০০ জন লোককে প্রকাশ্য দিবালোকে একে একে জবাই করে খুন (বনি কুরাইজা) করতেও যার (মহানবী মুহাম্মদ) একটুও দ্বিধা হয় না, তারা ধর্ম-শাস্ত্রে 'মহাকামেল' রূপে চিহ্নিত। উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত চিকিৎসকরা নিরাপত্তার খাতিরে (Psychotic patient may be dangerous for self and others, specially with command hallucination - এরূপ ব্যক্তিকে এখন জরুরি ভিত্তিতে (psychiatric emergency) মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেন। অন্যথায় কোনো অঘটন ঘটলে উন্নত বিশ্বের যে কোনো দেশে সেই চিকিৎসককে দিতে হয় প্রচণ্ড আর্থিক ক্ষতিপূরণ (আমেরিকা হলে প্রায় মিলিয়ন ডলারের মামলা), সামলাতে হয় তার মেডিকেল লাইসেন্স বাতিলের ধাক্কা। 
৩৩:৫৬ সাক্ষ্য দেয়, "মুহাম্মদের প্রতি আল্লাহ পাকের 'সুগভীর প্রেম' "। প্রেমে পড়লে নাকি জ্ঞানীরা নির্বোধের মত আর নির্বোধরা জ্ঞানীদের মত আচরণ করেন। প্রেমিক-প্রেমিকার 'প্রয়োজনে' আসে না এমন সংলাপ গুরুত্বহীন হয়ে যায়। সে যাই হোক, সত্য হচ্ছে: দেহ-তত্বের বর্ণনায় আল্লাহ পাক এসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে "মৌনব্রত" পালন করেছেন। মৌনব্রত পালনের বিশেষ সুবিধা এই যে, অবিশ্বাসীরা এ বিষয়ে যত প্রশ্নই উত্থাপন করুন না কেন, 'আকাশে ফুটা (৫০:৬) অথবা ফাটল (৬৭:৫) ও পৃথিবীকে পেরেক (৭৮:৬-৭) মেরে স্থির” জাতীয় বিষয়ের মত হাসি-তামাসার কোন সুযোগই এখানে নেই!

২) অজ্ঞানতা
"ডিম্বাণু ও শুক্রাণু" খালি চোখে দেখা যায় না! আর তা তখন আবিষ্কারও হয়নি। মানুষের আবিষ্কারের আগে কোনো 'জ্ঞান" ধর্মগ্রন্থে খুঁজে পাওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই।
যা জানা নেই, তা বলা যায় না। সেক্ষেত্রে, মুহাম্মদের কল্পিত আল্লাহ আর যেইই হউন "বিশ্ব-স্রষ্টা" নন।

তাহলে? "নতুন" কী তথ্য আমাদের জ্ঞান ভাণ্ডারে যোগ হলো, যা আমাদের জানা ছিল না? নতুন তথ্যটি এই, র্বীর্য  কোত্থেকে তৈরি হয়।

৮৬: - এটা নির্গত হয় মেরুদন্ড বক্ষপাজরের মধ্য থেকে। 

What?! 

আধুনিক বিজ্ঞান

১) বীর্যের উপাদান দু'টি: শুক্রাণু এবং গ্রন্থি-রস। শুক্রাণু তৈরি হয় অণ্ডকোষে (Testes), আর গ্রন্থি-রস নির্গত হয় Prostrate, Seminal Vesicles and bulbourethral gland থেকে। বীর্য "কখনোই" মেরুদণ্ড (Vertebra) ও বক্ষপাজরের (Rib) মধ্য থেকে নির্গত হয় না।

২) মহাবিশ্বের প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুরই আদি উপাদান হলো "পরমাণু (Atom)"। আমাদের শরীর ও এর ব্যতিক্রম নয়। হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া প্রতিটি পরমাণুই একদা তৈরি হয়েছিল কোনো না কোন  নক্ষত্রের অভ্যন্তরে। তারপর সেই নক্ষত্রটির মৃত্যুকালে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে (Supernova Explosion) সেই পরমাণুগুলো ছড়িয়ে পরে মহাশূন্যে। তারপর মিলিয়ন-বিলিয়ন বছরে গ্র্যাভিটেশানাল শক্তিতে (Gravitational attraction) সেগুলো আবার একত্রিত হয়ে তৈরি হয় নতুন নক্ষত্র, গ্রহ ও উপগ্রহ। আমাদের সবারই "আদি উপাদানের" জন্ম কোনো না কোনো নক্ষত্রে। We are all star dust (Nuclear waste)। আমরা সবাই  (Everything in this universe) একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। এই বিশালত্বকে অন্তরে ধারণের অনুভূতির সাথে অন্য কোন অনুভূতিরই তুলনা হতে পারে না! The whole universe is within us and we are within the universe!

একটি ছোট্ট ভিডিও (৪ মিনিট): Stellar nucleosynthesis

*"অনুরূপ বাণী"-কুরানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যেগুলোর একটি হলো "পুনরাবৃত্তি। একই কথা ইনিয়ে বিনিয়ে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, একটু যোগ, একটু বিয়োগ করে বার বার ঘোষণা করা।

*'জিবরাইলের' মারফত খবর: বুখারী- Volume 5, Book 59, Number 443:
Narrated 'Aisha:
When the Prophet returned from Al-Khandaq (i.e. Trench) and laid down his arms and took a bath, Gabriel came and said (to the Prophet ), You have laid down your arms? By Allah, we angels have not laid them down yet. So set out for them." The Prophet said, "Where to go?" Gabriel said, "Towards this side," pointing towards Banu Quraiza. So the Prophet went out towards them.

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হেরেম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া; অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর।]

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন