লিখেছেন গোলাপ
করুণাময় আল্লাহ!
তিনি মহাজ্ঞানী!
মানুষকে শিখিয়েছেন ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology)। ঘোষণা করেছেন মানুষ সৃষ্টি হয় জমাট রক্ত (Clotted blood) থেকে এবং মাতৃগর্ভে সে ছিল রক্তপিণ্ড!
জমাট রক্ত থেকে মানুষ সৃষ্টি
৯৬:২ - সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।
৭৫:৩৬-৩৯ - মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে? সে কি
স্খলিত বীর্য ছিল না? অতঃপর সে ছিল রক্তপিন্ড, অতঃপর
আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল
নর ও নারী।
২২:৫ - হে লোকসকল! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হও, তবে (ভেবে দেখ)
আমি তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্যে। ---
৪০:৬৭ - তিনি তো তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা, অতঃপর শুক্রবিন্দু দ্বারা,
অতঃপর জমাট রক্ত দ্বারা, অতঃপর তোমাদেরকে বের করেন শিশুরূপে,
অতঃপর তোমরা যৌবনে পদর্পণ কর, অতঃপর বার্ধক্যে উপনীত হও। তোমাদের কারও কারও এর পূর্বেই
মৃত্যু ঘটে এবং তোমরা নির্ধারিত কালে পৌঁছ এবং তোমরা যাতে অনুধাবন কর।
মাতৃগর্ভে মানব শিশুর 'পর্যায়ক্রমিক সৃষ্টিতত্বের"
ধারাবিবরণী:
২৩:১২-১৪ -আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি
তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন
করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি,
অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছি, এরপর সেই মাংসপিন্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি।
নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়।
পাঠক, আসুন আমরা "২৩:১২-১৪" কে একটু মনোযোগের সাথে
পর্যবেক্ষণ করি। অত:পর, আধুনিক জ্ঞানের আলোকে তার সত্যতা নিরূপণের চেষ্টা করি।
প্রথম পর্ব -"শুক্রবিন্দুকে মায়ের পেটে স্থাপন।"
এরপর
দ্বিতীয় পর্ব -'শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে পরিবর্তন',
অতঃপর
তৃতীয় পর্ব -'জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণতকরণ',
এরপর
চতুর্থ পর্ব - সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি',
অতঃপর
পঞ্চম পর্ব - 'অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণ',
অবশেষে
ষষ্ঠ পর্ব - তাকে নতুন রূপে
দাঁড় করণ।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে
ছাত্রাবস্থায় প্রফেসার আবুল কাশেম স্যার আমাদেরকে Embryology পড়াতেন। ডিম্বাণু-শুক্রাণুর
মিলনের (Fertilization) পর কীভাবে এক-কোষ থেকে কোষ বিভাজন হয়ে ২৭০-২৯০ দিনে এক মানব
শিশুর জন্ম হয় তা তিনি খুব সুন্দরভাবে আমাদের শিখিয়েছেন। কুরানের ভ্রূণতত্ত্বের বর্ণনা
যে কত "উদ্ভট ও হাস্যকর" তা যে কোনো বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি একটু পড়াশুনা করলেই জানতে পারবেন। কারণ?
বর্তমানের পরীক্ষালব্ধ ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের আলোকে আজ আমরা
নিশ্চিত যে:
১) সন্তান জন্মের
"সর্বপ্রথম"
শর্ত হলো শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন (Fertilization)। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্য অত্যাবশ্যক (absolutely fundamental) তথ্যটিই
এখানে অনুপস্থিত! কেন? কারণটা কি "মৌনতা" নাকি "অজ্ঞতা"?(৫ম
পর্ব)।
২) শুক্রবিন্দু কখনোই (Never)"জমাট রক্ত" রূপে রূপান্তরিত হয় না।
তাই, 'জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করণের' কোনো প্রশ্নই আসে না!
৩) মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি কখনোই (Never) সৃষ্টি হয় না। মাংস ও হাড় দুটোরই
উৎস "Mesoderm"।
৪) অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণের কোন
প্রশ্নই আসে না। কারণ, শরীরের
প্রত্যেকটি দেহযন্ত্রের উদ্ভব ঘটে Ectoderm, Mesoderm and Endoderm (Germ layer) থেকে সমান্তরালে (Simultaneously)।
তাহলে? কুরানে ভ্রূণতত্ত্বের এই "উদ্ভট" বর্ণনার উৎস কী?
উৎস হলো গর্ভপাত ও সাধারণ প্রাত্যহিক পর্যবেক্ষণ লব্ধ জ্ঞান। গর্ভপাতের ফলে যে
সকল জরায়ু-অভ্যন্তরস্থ বস্তু নির্গত
হয়, তা আপাতঃদৃষ্টিতে 'জমাট রক্ত ও মাংসপিণ্ডই"
মনে হয়। আর মানুষসহ প্রতিটি প্রাণীর গঠনপ্রকৃতির
সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে তার সবচেয়ে ভেতরের অংশে থাকে "অস্থি"। আর সেই
অস্থির চারপাশে মাংসপিণ্ডের আবরণ। পর্যবেক্ষণলব্ধ এই জ্ঞানের আলোকে প্রাচীন গ্রীসে
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে চিকিৎসক হিপোক্রিটাসই (Hippocrates) সর্বপ্রথম ভ্রূণতত্ত্বের ধারণা প্রকাশ করেন।
এর অনেক পরে গ্রীসেরই আর এক অত্যন্ত প্রতিভাবান চিকিৎসক, ডাঃ গ্যালেন (Galen), ভ্রূণতত্ত্বের ধারণা লিপিবদ্ধ করেছিলেন ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে। মুহাম্মদের জন্মের ৪২০ বছর পূর্বে। ডা: গ্যালেন তার ভ্রূণ-তত্বে
চারটি পর্বের বর্ণনা দেন। সেগুলো হলো:
১) বীর্যরস
(Arabic nutfah) সমৃদ্ধ অবস্থা - যা গর্ভপাতের সময় দেখা যায়।
২) রক্ত-মিশ্রিত
(Arabic alaqa) মাংসপিণ্ডবৎ অবস্থা। যাতে কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবস্থায় স্পষ্ট নয়
("ভ্রূণ")।
৩) বাহু (limbs) ও
অন্যান্য অঙ্গের অধিকতর স্পষ্টাবস্থা (Arabic mudghah)।
৪) স্পষ্ট আকৃতি শিশু
অবস্থা (Arabic ‘a new creation’):
"... The time has come for nature to
articulate the organs precisely and to bring all the parts to completion. Thus it caused flesh to grow on and
around all the bones, and at the same time ... it made at the ends of
the bones ligaments that bind them to each other, and along their entire length
it placed around them on all sides thin membranes, called periosteal, on which
it caused flesh to grow.
ডা: গ্যালেনের ধারণাটি
প্রযুক্তিবিহীন সেই সময়ের খালি চোখে পর্যবেক্ষণলব্ধ (nacked eye observation) ভ্রূণতত্ত্বের প্রাথমিক ধারণা। তার ধারণাটি ভুল হলেও বিজ্ঞানে তাঁর এই অবদানকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার
অবকাশ নেই। তিনি কখনোই দাবী করেননি যে, তাঁর ধারণাটি 'ঈশ্বর থেকে প্রাপ্ত'। মুহাম্মদের সময়ে
চিকিৎসকরা তাঁর এই ধারণাটির সাথে সম্যক পরিচিত ছিলেন। তাই, প্রবক্তা মুহাম্মদের পক্ষে তার চারপাশের
যে কোনো চিকিৎসকের কাছ থেকে এ ধারণাটি জানা নিতান্তই সম্ভব। যুক্তির খাতিরে ধরে নেওয়া
যাক যে, নিরক্ষর মুহাম্মদের পক্ষে কোনোভাবেই ডাঃ গ্যালেনের 'ভ্রূণতত্ত্বটি” জানার কোনো সুযোগই ছিল না। "স্বয়ং আল্লাহ" জিবরাইল মারফত ঐশী বাণীর মাধ্যমে মুহাম্মদকে
বিশেষভাবে তা শিখিয়েছেন। আর তা কাকতালীয় ভাবে ডাঃ গ্যালেনের ধারণারই প্রায় হুবহু। সবজান্তা
ও মহাজ্ঞানী আল্লাহর নামে প্রবক্তা মুহাম্মদের ভ্রূণতত্ত্ব:
শুক্রাণু স্থাপন > জমাট রক্ত ও মাংসপিণ্ড
> হাড্ডি > হাড্ডিকে মাংসপিণ্ড দ্বারা আবৃতকরণ! আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আজ আমরা নিশ্চিতরূপে
জানি যে, এই
তত্বের একমাত্র
সর্বজনবিদিত প্রথম পর্বটি ছাড়া পরবর্তী প্রত্যেকটি পর্ব এতই অসাড় যে, তাকে “প্রলাপ”
ছাড়া আর কোনোভাবে আখ্যায়িত করা যায় না।
সাধারণ মুসলমানদের
কুরান ও বিজ্ঞানের অজ্ঞানতাকে পুঁজি করে অর্থপ্রাপ্তি ও মুসলিম মানসের (প্রায় ১২৬ কোটি পাবলিক) দুর্বলতাকে লক্ষ্যমাত্রায় রেখে কিছু বিদ্বান তাঁদের অসৎ কার্যক্রম চালান। বিভ্রান্ত
করেন সাধারণ মুসলমানদের। আর মুসলিম মানস এমনই যে,
কোনো মুসলমান যদি মুসলমানদের প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে কিছু লেখেন, তাঁকে অবলীলায়
ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী (প্রবাসী হলে ইহুদীদের চর) আখ্যা দেওয়া হয়। আর কোনো অমুসলিম
যদি ইসলামের পক্ষে লেখেন, তবে তিনি হন মুসলিম জগতের "বিখ্যাত হিরো”। “বাইবেল কুরান
ও বিজ্ঞান” বইয়ের লেখক ডাঃ মরিস বুকাইলী এবং কানাডিয়ান ডাঃ কীথ মুর সেই হিরোদের অন্যতম।
ডাঃ মরিস বুকাইলী তার সে বইতে "এমন চাপা
মারিয়াছেন" যে ডাঃ উইলিয়াম ক্যাম্পবেলকে সেই চাপার প্রতি উত্তরে আরেকটি পুরা
বইই রচনা করতে হয়েছে। বাংলায় অনূদিত ডা: ক্যাম্পবেলের সেই বইটির ঠিকানাটি এখানে। আর ডা: মুর? Wall Street Journal এর তত্বাবধানে ২০০২ সালে
ডা: মায়ার নামের এক embryologist ডা: মুরের সাথে এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারের আহ্বান
জানালে ডা: মুর তা এড়িয়ে যান এই বলে যে, "it's been ten or eleven years since I
was involved in the Qur'an."
আধুনিক বিজ্ঞান
১) শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর
মিলনের ফলে ৪৬ টি ক্রোমোসম বিশিষ্ট "একটি" পূর্নাঙ্গ মানব কোষের (zygote) জন্ম হয় সাধারণত: Fallopian Tube এর ভিতরে।
২) Zygote বিভাজিত (Mitotic cell division) হয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটি কোষ থেকে দুইটি, দুইটি থেকে চারটি,
চারটি থকে আটটি --। একই সাথে তা ক্রমান্বয়ে Fallopian tube এর মধ্য দিয়ে জরায়ুর দিকে
অগ্রসর হতে থাকে।
৩) তৃতীয় দিনের মাথায় Zygote টি একটি বলিষ্ঠ বলের আকার ধারণ করে (Morula)।
৪) Morula আরও বিভাজিত
ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে (Blastcyst) সপ্তম
দিনের মাথায়
জরায়ু আভ্যন্তরীণ
দেয়ালে অবস্থান নেয় (Endometrial Implantation)।
৫) এই Blastcyst এর কোষগুলি দুই স্তরে বিভক্ত থাকে:
ক) বাহিরের স্তরের কোষ (Trophoblast) দিয়ে তৈরি
হয় "Placenta"
- যার মাধ্যমে মায়ের কাছ থেকে ভ্রূণটি
(embryo) পায় পুষ্টি।
খ) ভিতরের স্তরের কোষগুলো (Inner Cell Mass) প্রায় দুই সপ্তাহের শেষে তিনটি স্তরে বিভক্ত
হয়ে তৈরি করে "সমস্ত
দেহ-যন্ত্র"। এই তিনটি স্তরের নাম: Ectoderm, Mesoderm and
Endoderm। তিনটি স্তরই একই সাথে (Simulatneously) বৃদ্ধিপ্রাপ্ত
হয়ে ক্রমান্বয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের উদ্ভব ঘটায়। একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা:
* Ectoderm থেকে
উদ্ভব: ব্রেন এবং স্পাইনাল
কর্ড (Central Nervous System) ও অন্যান্য স্নায়ু তন্ত্র, চোখের লেন্স, চামড়ার বাহিরের
স্তর (Epidermis), চুল, স্তন-গ্রন্থি
(mammary glands)।
* Mesoderm থেকে
উদ্ভব: অস্থি (Skeleton);
অস্থি সংলগ্ন মাংসপেশি (skeletal muscle); চামড়ার ভিতরের স্তর (dermis); মূত্র ও যৌন
যন্ত্র (urogenital system); হৃৎপিণ্ড, রক্ত ও রক্তনালী (Cardiovascular system); কিডনি;
এবং প্লীহা (Spleen)।
* Endoderm থেকে
উদ্ভব: পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত
ও বৃহদান্ত (Gastrointestinal system); যকৃত (liver); অগ্নাশয় (pancreas); ফুসফুস
(lungs)ও শ্বাস যন্ত্র (Respiratory system); Thyroid and parathyroid
glands.
দু'টি প্রাসঙ্গিক ভিডিও। দ্বিতীয়টি অসাধারণ!
পুনশ্চ: "একটিই যথেষ্ট, দুইটি অতিরিক্ত"
শুধু “একটি মাত্র”
ভুল-অবাস্তব অথবা অসামঞ্জস্য থাকলেই একশত ভাগ সুনিশ্চিত ভাবেই বলা যাবে যে কুরান
'বিশ্ব-স্রষ্টার' বাণী হতে পারে না । সেক্ষেত্রে, মুহাম্মদের দাবী মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অথবা মানসিক বিভ্রম
(Psychosis)।
[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন
আবদুল আজিজ (হেরেম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে
নেয়া; অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে]
(চলবে)


























