শনিবার, ৯ জুলাই, ২০১১

ইছলামী বিনোদনপাঠ – ০৪

মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
প্রথম আলোয় প্রকাশিত

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, স্বামী স্ত্রীকে শারীরিক বা মানসিকভাবে কোনো ধরনের নির্যাতন বা প্রহার করবে না। স্ত্রীর ওপর যদি স্বামী কোনো কারণে রেগে যায়, তবু তাকে অশ্লীলভাবে গালিগালাজ করবে না (অর্থাৎ ইসলামের বিধান অনুযায়ী, গালিগালাজ করা জায়েয, সেটা অশ্লীল না হলেই হলো)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি (স্ত্রীর) মুখমণ্ডলের ওপর আঘাত করো না (এর মানে দাঁড়ায় এই যে, মুখমণ্ডল ছাড়া স্ত্রীর অন্যান্য সব অঙ্গে আঘাত করা যাবে! নবীজি, জিন্দাবাদ!), তাকে অশ্লীল গালিগালাজ করো না এবং গৃহ ব্যতীত অন্য কোথাও তাকে পৃথক করে রেখো না।’ (আবু দাউদ)

পবিত্র কোরআনে নারীদের অত্যন্ত সম্মান দেখানো হয়েছে এবং ইসলামে নারীদের নির্যাতন করার কোনো সুযোগ নেই (ভাইসব, অট্টহাসি বন্ধ করার দোয়া জানা আছে কারো?)। নারী নির্যাতনকারীকে ঘৃণ্য অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেসব কারণে নারীরা সমাজে নির্যাতিত হয়, সেসব থেকে বিরত থাকতে মুসলমানদের আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমানে সারা দুনিয়ায় নারী-পুরুষ কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। দেশেও নারী নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নির্যাতনের ফলে অনেকের মৃত্যু হয়, কেউ আত্মহত্যায় বাধ্য হয়। কখনো স্বামী স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে। এসবের মূলে রয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার অভাব এবং নারীর সম্পদের মোহ ও লোভ-লালসা তাদের অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অথচ এসব লোভনীয় জাগতিক উপকরণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নারী, সন্তান, সোনা ও রূপার ভান্ডার এবং পছন্দসই ঘোড়া ও চতুষ্পদ জন্তু এবং খেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের কাছে মনোরম করা হয়েছে (কেউ এইটার বাংলা কইরা দিবেন? "আসক্তি মানুষের কাছে মনোরম করা" মানে কী?)। এসবই পার্থিব ভোগ্যবস্তু এবং আল্লাহর কাছে উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৪)

সারা বিশ্বে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় প্রকার অর্থের লোভে বিদেশে নারী পাচার করে, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের জের হিসেবে বা যৌতুকের জন্য মারধর করে বা শ্বাসরুদ্ধ করে, বিষ প্রয়োগে, ধর্ষণের পর হত্যা করে, গুলি করে এবং এসিড নিক্ষেপসহ নানা উপায়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন চলছে। ইসলাম-পরিপন্থী এসব লোমহর্ষক নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করে সমস্যার সমাধানকল্পে ধর্মপ্রাণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা চালানো খুবই জরুরি। এসিড মেরে নারীর প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণ, যৌতুকের জন্য নিরীহ বধূর ওপর শ্বশুরালয়ের সবাই মিলে মানসিক নির্যাতন চালানো, কখনো শারীরিক অত্যাচার এমনকি অধিকাংশ সময় হত্যার ঘটনাও ঘটে থাকে। নারী নির্যাতন বন্ধে অভিভাবক মহলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা দরকার। সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে যে, নারী-পুরুষ মিলে যে ঘরসংসার, বহু ঘর নিয়ে যে মুসলিম সমাজ, সেখানে প্রত্যেকেরই গুরুত্ব, মর্যাদা, অধিকার ও ভূমিকা রয়েছে। নারী-পুরুষের সুন্দর শান্তিময় জীবন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও পুরুষদের ওপর নিয়মানুযায়ী (সুন্দর ও মধুময় আচরণ স্ত্রীদেরও প্রাপ্য) অধিকার আছে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত:২২৮) 

অথচ শহর-গ্রামে যে কত বিচিত্র পন্থায় অহরহ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাঙ্গনে-কর্মস্থলে সর্বত্র মেয়েদের নানা প্রকার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মেয়েদের জন্য সহজেই বৈরী হয়ে ওঠে। সুযোগ পেলেই একশ্রেণীর পুরুষ নারীর প্রতি অশোভন আচরণ করে থাকে। মানুষের অত্যধিক লোভ-লালসা ও সম্পদের মোহই তাদের সব পাপ কাজ ও নারীর প্রতি নির্যাতনের কারণ। তবে ধর্মপ্রাণ মানুষ চেষ্টা করলে সব ধরনের লোভ-লালসা এবং ধন-সম্পদের মোহকে সংযম, ভালোবাসা, আন্তরিক সদিচ্ছা এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে আয়ত্তে আনতে সক্ষম (সত্যকথনের জন্য ধন্যবাদ। আল্লাহভীতির কারণে চরিত্রবান, পুরস্কারের আশায় সৎ... বেশ, বেশ!)। এ জন্য তাদের সুবিচারক, সুবিবেচক, সচেতন ও বিচক্ষণ হতে হবে। নিজের সন্তানের প্রতি যেমন মায়া-মমতাবোধ রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে অন্যের সন্তানের (জামাতা, পুত্রবধূ ও অন্যান্য আত্মীয়ের) প্রতিও মায়া-মমতাবোধ ও ভালোবাসাকে জাগ্রত করতে হবে, তাহলে পৃথিবীতে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সমাজে এমন এক সচেতনতার বিকাশ প্রয়োজন, যাতে আইনের ভয়ে নয়, বরং দায়িত্ব ও কর্তব্যের আহ্বানে সমাজে পুরুষ সদস্যরা নারীর প্রতি সুন্দর এবং মর্যাদাবোধসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবে। সেই সঙ্গে মা-বোনদেরও নিজ নিজ মানবিক মর্যাদা এবং অধিকার ও কর্তব্যের প্রতি সজাগ থাকা উচিত। পুরুষ নারীর প্রতিপক্ষ নয়, নারী পুরুষের প্রতিপক্ষ নয়; বরং দুয়ে মিলেই সমাজ। এ সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির লালন এবং নৈতিকতার বিকাশের মধ্যেই নিহিত রয়েছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের বীজমন্ত্র।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। সমাজে নারী ও পুরুষের যে ন্যায্য অধিকার ও গুরুত্ব রয়েছে, উভয়ে মিলে তারা যে অভিন্ন সত্তা, এ মানবিকতাবোধকে পুরুষেরা গভীরভাবে উপলব্ধি না করলে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে না। কারণ নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নির্যাতনের মূল সূত্রটি লুক্কায়িত আছে। ইসলামি জীবনদর্শনে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরে আল্লাহ তাআলা যে সুন্দরতম বিধান দিয়েছেন, তা অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ(বিধানটা কি ভুয়া? নাইলে সেটা উদ্ধৃত করা হলো না কেন? আগে কয়েক জায়গায় তো ঠিকই কোটেশন ঝাড়া হলো!) ইসলামের বিধান যথাযথ কার্যকর হলে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন চিরতরে বন্ধ হবে এবং মানবজীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের সামাজিক বিধিবিধানগুলো ব্যাপক প্রচার ও প্রসার করতে সমাজের ধর্মীয় নেতাদের অগ্রণী ভূমিকা (দুই-একখান ধর্মীয় নেতার নাম ও অতীতে তাদের নেওয়া অগ্রণী ভূমিকার কয়েকটা উদাহরণ পাইলে বুঝতে সুবিধা হইতো।) পালন করতে হবে।

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

blog comments powered by Disqus